নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী আদালতপাড়া থেকে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট, নির্বাহী কোর্ট কিংবা জর্জ কোর্টকে পৃথক করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার যেকোনো উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন জেলা আইনজীবী শেখ আনজুম আহমেদ রিফাত। তার দাবি, আদালতের কার্যক্রম বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়বেন বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষ ও পেশাজীবীরা। তাই আদালত স্থানান্তরের প্রয়োজন হলে সবগুলো আদালতকে একটি সমন্বিত স্থানে নেওয়ার বিষয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েনিফোর ডটকমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে শেখ আনজুম আহমেদ রিফাত বলেন, নারায়ণগঞ্জের আদালতপাড়া দীর্ঘদিন ধরে জেলার বিচারব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। একই এলাকায় বিভিন্ন ধরনের আদালতের কার্যক্রম থাকায় আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই সহজে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে পারেন।
তিনি বলেন, কোনো একটি আদালতকে অন্যত্র সরিয়ে দিলে শুধু আইনজীবীদের কর্মপরিবেশই বিঘ্নিত হবে না, একই মামলায় বিভিন্ন আদালতে যাতায়াত করতে গিয়ে বিচারপ্রার্থীদের সময় ও অর্থ দুটোই বেশি ব্যয় হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শেখ আনজুম আহমেদ রিফাত বলেন, আদালত স্থানান্তরের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট, নির্বাহী কোর্ট কিংবা জর্জ কোর্টকে আলাদাভাবে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আইনজীবীদের হাতে কোনো সরকারি প্রজ্ঞাপন বা চূড়ান্ত নির্দেশনা আসেনি।
তিনি বলেন, ‘আদালত স্থানান্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন। কারণ আদালতের বাস্তব পরিস্থিতি, বিচারপ্রার্থীদের সুবিধা এবং প্রতিদিনের পেশাগত কার্যক্রম সম্পর্কে আইনজীবীরাই সবচেয়ে ভালো জানেন।’
রিফাত বলেন, আদালতপাড়ার বর্তমান কাঠামো পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিলে সেটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে করতে হবে। একটি আদালত পুরোনো জায়গায় রেখে অন্য আদালতকে দূরে সরিয়ে দেওয়া কোনো কার্যকর সমাধান হতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের অবস্থান খুব পরিষ্কার। আদালতের অবস্থান পরিবর্তন করতে হলে সামগ্রিক পরিকল্পনা থাকতে হবে। সব আদালতের জন্য যদি নতুন ও উপযুক্ত একটি জায়গা নির্ধারণ করা হয়, তাহলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু আদালতপাড়াকে টুকরো করে একেকটি আদালত একেক জায়গায় নেওয়ার প্রস্তাব কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়।’
সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, অতীতেও আদালতের অবস্থান পরিবর্তন নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা হয়েছিল। তখন নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার জায়গা নিয়েও সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কয়েকটি স্থান পরিদর্শন করে বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন।
শেখ আনজুম আহমেদ রিফাত বলেন, সেই সময়ও আইনজীবীদের পক্ষ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছিল—নতুন কোনো স্থানে আদালত স্থানান্তরের উদ্যোগ নিতে হলে সেখানে পর্যাপ্ত অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, আইনজীবীদের পেশাগত সুবিধা এবং বিচারপ্রার্থীদের সহজে যাতায়াতের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘শুধু জায়গা পাওয়া গেলেই আদালত স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। সেখানে আইনজীবীদের বসার ব্যবস্থা, বিচারপ্রার্থীদের অপেক্ষার স্থান, নিরাপত্তা, যাতায়াত, যানবাহন ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অবকাঠামো সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে।’
আদালতপাড়া বিভক্ত করার যেকোনো উদ্যোগের বিষয়ে আইনজীবীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া নেওয়া হলে পেশাজীবী মহলে স্বাভাবিকভাবেই অসন্তোষ তৈরি হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কোনো ধরনের সংঘাত বা অস্থিরতা চাই না। আলোচনার মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু আইনজীবীদের মতামতকে পাশ কাটিয়ে যদি একতরফাভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তাহলে আইনজীবীরা তাদের ন্যায্য দাবি নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিকভাবে অবস্থান নেবেন।’
কয়েকজন আইনজীবী আদালত স্থানান্তরের বিষয়ে ভিন্নমত বা পৃথক উদ্যোগ নিচ্ছেন এমন আলোচনা প্রসঙ্গে শেখ আনজুম আহমেদ রিফাত বলেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগে নয়, আদালতের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত সমষ্টিগত আলোচনার ভিত্তিতেই হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের বিচারাঙ্গনের স্বার্থে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আদালত কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়; এটি সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। তাই এর কাঠামো বা অবস্থান পরিবর্তনের সিদ্ধান্তও হতে হবে জনস্বার্থকে সামনে রেখে।’
তিনি আরও বলেন, বর্তমান আদালতপাড়ার সমস্যা থাকলে সেগুলো চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে সমাধান করা যেতে পারে। প্রয়োজনে নতুন ভবন নির্মাণ, অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা আদালত চত্বর সম্প্রসারণের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সবশেষে শেখ আনজুম আহমেদ রিফাত বলেন, নারায়ণগঞ্জের আদালতপাড়াকে বিভক্ত করে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে দেওয়া উচিত নয়। ভবিষ্যতে আদালত স্থানান্তরের প্রয়োজন হলে আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নিয়ে সমন্বিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
‘আদালতের কার্যক্রমকে আরও সহজ, গতিশীল ও জনবান্ধব করাই আমাদের লক্ষ্য। সে ক্ষেত্রে কোনো একটি আদালতকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পরিবর্তে পুরো বিচারব্যবস্থাকে কীভাবে আরও সুন্দরভাবে পরিচালনা করা যায়, সেটিই সবার আগে ভাবতে হবে,’ বলেন তিনি।

