দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম এবং নির্বাচন পরবর্তী নতুন বাস্তবতায় নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের দাবি, নেতৃত্বের ব্যস্ততা, পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে বিলম্ব, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে জেলার অন্যতম শক্তিশালী এই রাজনৈতিক সংগঠনটি বর্তমানে অনেকটাই ছন্দহীন অবস্থায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক সময় আন্দোলন-সংগ্রাম, কর্মসূচি ও সাংগঠনিক তৎপরতায় সরব থাকা জেলা ও মহানগর বিএনপি এখন অনেক ক্ষেত্রেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। মাঠপর্যায়ে বড় ধরনের কোনো কর্মসূচি না থাকায় নেতাকর্মীদের মধ্যেও আগের মতো উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকী পালনেও অতীতের তুলনায় তেমন জৌলুস দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন অনেকেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচনী প্রস্তুতি, সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই এবং রাজনৈতিক সমীকরণ সামাল দেওয়ার ব্যস্ততায় স্থানীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। ফলে তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্বের শূন্যতা ও সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ বর্তমানে জেলা পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করায় সাংগঠনিক কাজে আগের মতো সময় দিতে পারছেন না। একইভাবে জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তার রাজনৈতিক ব্যস্ততাও বেড়েছে। অন্যদিকে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করায় মহানগর বিএনপির কার্যক্রমেও তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা কমে এসেছে বলে নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করছে।
এ অবস্থায় জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে দূরত্ব এবং সাংগঠনিক দুর্বলতার বিষয়টি আরও প্রকট হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মেয়াদোত্তীর্ণ ইউনিট কমিটি পুনর্গঠন, নতুন নেতৃত্ব তৈরি এবং পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় তৃণমূল পর্যায়ে অসন্তোষ বাড়ছে।
নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দায়িত্বশীল কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়নের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার এবং ব্যক্তি বলয়ের রাজনীতি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে বিভিন্ন ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও পাড়া-মহল্লায় অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতা নিজেদের অবস্থান জাহির করতে গিয়ে বিতর্কের জন্ম দিচ্ছেন। এসব কারণে সাংগঠনিক শৃঙ্খলাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে কাউন্সিল ও সম্মেলনের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের কথা থাকলেও জেলা ও মহানগর বিএনপিতে দীর্ঘদিন ধরে সেই প্রক্রিয়া কার্যকর হয়নি। বরং একের পর এক আহ্বায়ক কমিটি গঠন ও পুনর্গঠনের সংস্কৃতি সংগঠনের ভেতরে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের টানাপোড়েন এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধীরগতি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জে বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি থাকলেও তা ধরে রাখতে হলে দ্রুত তৃণমূলকে সক্রিয় করতে হবে। ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ে কার্যকর কমিটি ছাড়া বৃহৎ রাজনৈতিক কর্মসূচি সফল করা কঠিন হবে।
এদিকে ঈদুল আজহার পর দল গোছানোর উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা থাকলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো বড় সাংগঠনিক কর্মসূচি দেখা যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট নেতারা বলছেন, তৃণমূলকে মূল্যায়ন, পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসন এবং নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে সংগঠনকে আবারও গতিশীল করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত জেলা ও মহানগর বিএনপির পূর্ণাঙ্গ ও গ্রহণযোগ্য কমিটি গঠন করা হবে। একই সঙ্গে পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের মাধ্যমে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করা গেলে নারায়ণগঞ্জে বিএনপি আবারও আগের অবস্থানে ফিরে যেতে সক্ষম হবে বলে মনে করছেন তারা।
রাজনৈতিক মহলের অভিমত, নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভ্যন্তরীণ বিভক্তি কমিয়ে ঐক্যবদ্ধ সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা। আর সেটি সম্ভব হলে জেলার রাজনীতিতে দলটি নতুন করে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

