একসময় নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আলোচিত ও প্রভাবশালী নাম ছিল ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। রাজপথের কর্মসূচি, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, নগর উন্নয়ন এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচন সবকিছুতেই দীর্ঘ সময় ধরে সরব ছিলেন তিনি। কিন্তু প্রায় ১৩ মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর সেই পরিচিত রাজনৈতিক ব্যস্ততার চিত্র আর দেখা যাচ্ছে না। প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাঁর উপস্থিতি নেই, দলীয় সাংগঠনিক তৎপরতায়ও তাঁকে দৃশ্যমানভাবে পাওয়া যাচ্ছে না।
ফলে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন বড় প্রশ্ন কোথায় আইভী? কেন তিনি নীরব? এই নীরবতা কি সাময়িক, নাকি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নতুন কোনো অধ্যায়ের সূচনা?
আইভীর রাজনৈতিক পরিচয় অবশ্য নতুন নয়। ১৯৮৪ সালে তিনি নারায়ণগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড কমিটির সদস্য হন। পরে ১৯৯৩ সালে নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক এবং ২০০৩ সালে শহর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হন। একই বছর তিনি নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত পৌরসভার চেয়ারম্যান থাকার পর ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। এরপর ২০১৬ ও ২০২২ সালেও মেয়র নির্বাচিত হয়ে টানা তিন মেয়াদ দায়িত্ব পালন করেন। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সরকারি তালিকায় তাঁর মেয়র হিসেবে সর্বশেষ মেয়াদ ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২ থেকে ১৯ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত দেখানো হয়েছে।
২০১৬ সালে তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতির দায়িত্বও পান। অর্থাৎ নগর প্রশাসনের পাশাপাশি দলীয় রাজনীতিতেও তাঁর একটি শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছিল। নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আইভীর সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি ছিল আওয়ামী লীগেরই আরেক প্রভাবশালী বলয় ওসমান পরিবারের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব।
২০১১ সালের প্রথম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী এ কে এম শামীম ওসমানকে পরাজিত করে আইভীর বিজয় নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনে। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতেও তিনি জয় ধরে রাখেন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতেও দলীয় অভ্যন্তরীণ বিরোধের মধ্যে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করার মতো কঠোর রাজনৈতিক অবস্থান নিতে দেখা যায় তাঁকে। অর্থাৎ কারাগারে যাওয়ার আগ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক মেরুকরণে আইভী ছিলেন দৃশ্যমান একটি কেন্দ্র।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়রের পদ থেকে তাঁকে অপসারণ করা
আর ২০২৫ সালের ৯ মে ভোরে দেওভোগের ‘চুনকা কুটির’ থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় একের পর এক মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরবর্তী সময়ে মোট ১২টি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
আইভীর কারাবাসও ছিল দীর্ঘ। প্রায় ৩৯১ দিন কারাগারে থাকার পর ২০২৬ সালের ৩ জুন রাতে তিনি কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান এবং রাতেই নারায়ণগঞ্জের দেওভোগের নিজ বাড়ি চুনকা কুটিরে ফেরেন।
তাঁর বিরুদ্ধে মামলাগুলোতে বিভিন্ন সময়ে জামিন হলেও নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ঘটনা ঘটেছিল। এমনকি ২০২৬ সালের এপ্রিলে হাইকোর্ট একের পর এক মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানোর বৈধতা নিয়ে রুল জারি করে এবং নতুন মামলায় হয়রানি বা গ্রেপ্তার না করার নির্দেশ দেয়। ১০টি মামলায় তাঁর জামিন আপিল বিভাগ বহাল রাখার পর মুক্তির পথ পরিষ্কার হয়।
কারাগার থেকে বের হয়ে আইভী কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির ঘোষণা দেননি। বরং তিনি সরকার ও বিচার বিভাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, তিনি এমন একটি মানবিক সরকার চান যেখানে সবাইকে নিয়ে কাজ করা হবে। একই সঙ্গে কারাগারে থাকা অন্যদের প্রতিও সদয় হওয়ার আহ্বান জানান।
এটি ছিল তাঁর মুক্তির পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্যগুলোর একটি। কিন্তু এরপর তাঁর প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতা খুব সীমিতই থেকেছে।
মুক্তির পর আইভীর সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ্য উপস্থিতি ছিল রাজনৈতিক মঞ্চে নয়, আদালতে। ২৮ জুলাই ২০২৬ তিনি পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে করা একটি মামলায় আদালতে হাজির হন। অর্থাৎ কারামুক্তির প্রায় ৫৫ দিন পর তাঁর প্রকাশ্য উপস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল আদালতকেন্দ্রিক। সেদিন আদালত থেকে বের হয়ে তিনি বলেন, “নির্দোষ হয়েও আমি অপরাধী।” একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জে হত্যা, অত্যাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘদিনের অবস্থানের কথাও বলেন।
এখানেই বর্তমান আইভীর রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে অতীতের পার্থক্যটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে একসময় যিনি রাজনৈতিক বিরোধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতেন, বর্তমানে তাঁর প্রকাশ্য তৎপরতার বড় অংশই মামলা ও বিচারপ্রক্রিয়াকে ঘিরে।
কারাগার থেকে মুক্তির পর আইভীর দেওভোগের বাড়ির সামনে পুলিশি নজরদারিও বাড়ানো হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, একদিকে তাঁর নিরাপত্তা বিবেচনা করা হচ্ছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ রাজনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যেন কোনো কর্মসূচিতে তিনি যুক্ত না হন, সেটিও নজরদারির অংশ। তাঁর বাড়ির আশপাশে সিসিটিভি ও সাদা পোশাকের পুলিশ মোতায়েনের কথাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এই বাস্তবতাও তাঁর প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট।
কারামুক্তির পর আইভী রাজনৈতিক কর্মসূচির বাইরে রয়েছেন এবং তাঁর প্রকাশ্য তৎপরতা অনেকটাই সীমিত। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো এখনো তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
কারামুক্ত হলেও তাঁর বিরুদ্ধে মামলাগুলো শেষ হয়ে যায়নি। ফলে আইনি বাস্তবতা তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করছে।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর বর্তমান বিধিনিষেধের প্রেক্ষাপটে আইভীর জন্য প্রকাশ্য দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগও আগের মতো নেই। পুলিশের বক্তব্যেও এ বিষয়টি এসেছে।
আইভী মেয়র থাকা অবস্থায় যে রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল, বর্তমানে তা অনেকটাই পরিবর্তিত। নতুন রাজনৈতিক শক্তি, বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে। ফলে আইভী যদি আবার সক্রিয় হন, তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা আগের কাঠামোর মধ্যে থাকবে কি না সেটিও একটি প্রশ্ন।
আইভীর রাজনৈতিক জীবন দেখলে বোঝা যায়, তাঁর পথচলা কখনোই পুরোপুরি সরল ছিল না। চিকিৎসক থেকে রাজনীতিতে আসা, পৌর চেয়ারম্যান হওয়া, টানা তিনবার সিটি মেয়র নির্বাচিত হওয়া, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধে অবস্থান নেওয়া প্রতিটি পর্যায়েই তিনি আলোচনায় ছিলেন।
কিন্তু ২০২৪-এর রাজনৈতিক পালাবদল, মেয়র পদ হারানো, ২০২৫ সালে গ্রেপ্তার এবং ৩৯১ দিনের কারাবাসের পর ২০২৬ সালে জামিনে মুক্তি এই ধারাবাহিকতায় তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বড় একটি বিরতি তৈরি হয়েছে।
তবে এই নীরবতা স্থায়ী কিনা, নাকি আইনি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে তিনি আবারও নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে প্রকাশ্যে ফিরবেন তার উত্তর এখনো সময়ই দেবে।

