ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দ্বিতীয় অধ্যায় নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছেন ক্লাবটির সাবেক কোচ এরিক টেন হাগ। পর্তুগিজ মহাতারকার পেশাদারত্ব, শারীরিক প্রস্তুতি এবং দলের প্রতি দায়িত্ববোধ নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন এই ডাচ কোচ। তার দাবি, রোনালদো প্রত্যাশিত ফিটনেস অর্জন করতে পারেননি, মাঠে বল থাকা কিংবা না থাকা- কোনো অবস্থাতেই দলের জন্য প্রয়োজনীয় পরিশ্রম করেননি। এতে শুধু দলই নয়, ব্যক্তিগতভাবেও হতাশ হয়েছিলেন তিনি।
২০২২ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে রোনালদোর দ্বিতীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়েছিল তিক্ততার মধ্য দিয়ে। তৎকালীন কোচ টেন হাগের সঙ্গে মতবিরোধ এবং সাংবাদিক পিয়ার্স মরগ্যানকে দেওয়া বহুল আলোচিত সাক্ষাৎকারের পর ওল্ড ট্রাফোর্ড ছাড়েন পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই তারকা।
এবার সেই সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রোনালদোর আচরণ নিয়ে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন টেন হাগ। তার মতে, রোনালদোর আচরণ ড্রেসিংরুমের অন্য খেলোয়াড়দের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
দ্য অ্যাথলেটিককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টেন হাগ জানিয়েছেন, রোনালদোকে ঘিরে তার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিস্থিতি এগোয়নি। টেন হাগের ভাষায়, ‘সে দলকে হতাশ করেছে, আমাকে হতাশ করেছে। কারণ, আমরা তাকে নিয়ে পরিকল্পনা করেছিলাম।’
রোনালদোর সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে নিজের আগ্রহের কথাও জানিয়েছেন সাবেক এই ইউনাইটেড কোচ। তার দাবি, ক্লাবের দায়িত্ব নেওয়ার আগে নিজের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে তিনি পর্তুগাল পর্যন্ত গিয়েছিলেন রোনালদোর সঙ্গে দেখা করতে।
টেন হাগ বলেন, ‘আমি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে আসার আগে কী করতে চাই, তা নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে পর্তুগাল গিয়েছিলাম। অবশ্যই, সে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। আমি তাকে অনেক সম্মান করতাম। কিন্তু তখন একজন কোচ হিসেবে আমাকে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল এবং যেসব খেলোয়াড়কে আমি শ্রদ্ধা করি, তাদের দলে রাখার বিষয়েও ভাবতে হয়েছিল।’
অর্থাৎ, রোনালদোর প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও দলের প্রয়োজন বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল বলে জানিয়েছেন টেন হাগ। তার বক্তব্যে স্পষ্ট, খেলোয়াড় হিসেবে রোনালদোর অতীত অর্জনকে অস্বীকার না করলেও দলের জন্য তার কাছ থেকে যে ভূমিকা প্রত্যাশা করেছিলেন, তা পূরণ হয়নি বলে মনে করেন সাবেক এই কোচ।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে রোনালদোর দ্বিতীয় মেয়াদে তার মাঠের বাইরের পরিশ্রমের বিষয়টি ছিল আলোচনার অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে প্রতিপক্ষের বল দখলে থাকলে প্রেসিং করা এবং দলকে রক্ষণে সহায়তা করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল।
টেন হাগের অভিযোগ, সমস্যাটি শুধু প্রেসিংয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; রোনালদো প্রত্যাশিত শারীরিক প্রস্তুতি নিয়েও মাঠে নামতেন না। ফলে আক্রমণ ও রক্ষণ- দুই ক্ষেত্রেই তার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অবদান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল বলে দাবি করেছেন তিনি।
সাবেক এই কোচ বলেন, ‘আমি তাকে অনেকবার বলেছি- রনি, তোমাকে সঠিক জায়গায় পৌঁছে দিতে সবাই তোমার জন্য কাজ করতে চায়। কিন্তু তুমি যদি নিজে বক্সে পৌঁছাতে না পারো, তাহলে গোল করতে পারবে না- সে এটা করতে সক্ষম হচ্ছিল না।’
রোনালদোকে দিয়ে অতিরিক্ত প্রেসিং করানোর প্রত্যাশা থেকেই সমস্যা তৈরি হয়েছিল- এমন ধারণাও নাকচ করেছেন টেন হাগ। তার দাবি, মাঠে বল নিজেদের দখলে থাকুক কিংবা প্রতিপক্ষের দখলে, রোনালদো প্রত্যাশিতভাবে দৌড়াচ্ছিলেন না।
টেন হাগের ভাষায়, ‘এটা ভুল ধারণা যে আমি তার কাছে প্রেসিং আশা করেছিলাম এবং সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সে তা পারছিল না। বল আমাদের দখলে থাকলেও সে দৌড়াচ্ছিল না, বলের দখল না থাকলেও না। এর কারণ ছিল, সে নিজেকে প্রস্তুত করেনি।’
রোনালদোর মতো বিশ্বমানের খেলোয়াড়ের কাছ থেকে যে ধরনের শারীরিক প্রস্তুতি ও মাঠের পরিশ্রম প্রত্যাশিত, তা তিনি পাচ্ছিলেন না- টেন হাগের বক্তব্যের মূল সুর সেটিই।
টেন হাগ মনে করেন, যে কোনো বড় দলের সাফল্যের জন্য তারকা খেলোয়াড়কে ঘিরে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। তবে সেই তারকারও দলের স্বার্থে কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি বড় দলকেই নিজেদের সেরা খেলোয়াড়কে আপন করে নিতে হবে। কিন্তু সেই সেরা খেলোয়াড়কেও দলের জন্য কাজ করতে হবে।’
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে টেন হাগ মূলত দলীয় শৃঙ্খলা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর জোর দিয়েছেন। তার দৃষ্টিতে, একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত সামর্থ্য যতই বেশি হোক, দলের কৌশল বাস্তবায়ন এবং সম্মিলিত সাফল্যের জন্য তাকে সতীর্থদের সঙ্গে সমন্বয় করে খেলতে হবে।
রোনালদোর ক্ষেত্রে সেই সমন্বয়ের অভাব ছিল বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। যদিও রোনালদোর ব্যক্তিগত দক্ষতা কিংবা ফুটবল ইতিহাসে তার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি টেন হাগ, তবে দলের প্রয়োজনের সঙ্গে তার ভূমিকা সব সময় সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না বলে অভিযোগ করেছেন।
সাক্ষাৎকারে টেন হাগ শুধু রোনালদোর ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স নিয়েই কথা বলেননি; দলের অন্য খেলোয়াড়দের দায়িত্ববোধ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিনি। তার মতে, কিছু খেলোয়াড়ের কাছে ফুটবল কিংবা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড প্রত্যাশিত গুরুত্ব পায়নি।
টেন হাগ বলেন, ‘খেলোয়াড়দের নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাদের বড় দায়িত্ব রয়েছে। কিছু মানুষের কাছে ফুটবল সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার নয়। আর ইউনাইটেডও কিছু খেলোয়াড়ের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ছিল না।’
রোনালদোর আচরণ ড্রেসিংরুমের অন্য খেলোয়াড়দের ওপর প্রভাব ফেলেছিল কি না, সে বিষয়ে সরাসরি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না দিলেও তার মন্তব্যে সেই আশঙ্কার ইঙ্গিত রয়েছে।
সে সময় মার্কাস রাশফোর্ড ও জেডন সানচোর মতো খেলোয়াড়দের মনোভাব ও আচরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার খবরও প্রকাশিত হয়েছিল। তবে টেন হাগের বক্তব্যে রোনালদোর আচরণই তাদের সমস্যার সরাসরি কারণ- এমন কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।
রোনালদো ২০২২ সালের শেষ দিকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ছাড়লেও টেন হাগ আরও প্রায় দেড় বছর ক্লাবটির দায়িত্বে ছিলেন। তার অধীনে ইউনাইটেড ২০২৩ সালে ইএফএল কাপ এবং ২০২৪ সালে এফএ কাপ জেতে।
তবে ট্রফি জয়ের পাশাপাশি দল পরিচালনা, খেলোয়াড়দের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্স নিয়েও তাঁর মেয়াদে নানা আলোচনা ছিল। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালে তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয় ইউনাইটেড।
এরপর ক্লাবটির দায়িত্বে আসেন পর্তুগিজ কোচ রুবেন আমোরিম। তার অধীনে ২০২৪-২৫ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে ১৫তম স্থানে থেকে প্রতিযোগিতা শেষ করে ইউনাইটেড। একই মৌসুমে ইউরোপা লিগের ফাইনালেও হেরে যায় দলটি।
পরবর্তী সময়ে মাইকেল ক্যারিকের অধীনে ইউনাইটেড আবার চ্যাম্পিয়নস লিগে জায়গা করে নেয়। তবে সরবরাহ করা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ মৌসুমে এসে দলটি আবারও পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে সংগ্রাম করছে।

