ত্যাগী, নির্যাতিত ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে নারায়ণগঞ্জে সুপরিচিত নাম জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুকুল ইসলাম রাজীব। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে গিয়ে তিনি একাধিকবার কারাবরণ করেন।
বিএনপি সরকার গঠনের পর নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘদিনের নির্যাতিত ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পান মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শাখাওয়াত হোসেন খান। পরে একই বছরের ১৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ১২ জুন নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনডিএ) চেয়ারম্যান পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুকুল ইসলাম রাজীব। আগামী এক বছরের জন্য তাকে এ দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
তবে এনডিএ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নে মাসুকুল ইসলাম রাজীব কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন?
নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, জলাবদ্ধতা নিরসন, খাল ও জলাশয় রক্ষা, সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ—এসবই এনডিএর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। দীর্ঘদিন ধরে এসব বিষয়ে নানা অভিযোগ থাকলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে প্রশাসনিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণই একজন চেয়ারম্যানের সাফল্য নির্ধারণ করবে।
নগরবাসীর মতে, শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নয়, কাজের মাধ্যমে আস্থা অর্জন করতে হবে নতুন চেয়ারম্যানকে। বিশেষ করে জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান রক্ষা এবং নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর বিষয়গুলোতে দ্রুত পদক্ষেপ দেখতে চান তারা।
মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্যবসায়ী বলেন, “রাজীব ভাই দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছেন, নির্যাতনও সহ্য করেছেন। এখন তিনি যে দায়িত্ব পেয়েছেন, সেটার প্রতিফলন যেন উন্নয়ন কাজে দেখা যায়। আমরা চাই তিনি রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে সবার চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করুন।”
অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম, আইনজীবী বলেন,“এনডিএ দীর্ঘদিন ধরেই অনেক সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান। কিন্তু পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গতি কম ছিল। নতুন চেয়ারম্যান যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারেন, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি বদলানো সম্ভব।”
শাহানা আক্তার বলেন, “শিশুদের জন্য খেলার মাঠ, পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চাই। এসব কাজ বাস্তবায়ন করতে পারলে মানুষ তাকে ইতিবাচকভাবেই মূল্যায়ন করবে।”
মো. কামরুল হাসান, তরুণ উদ্যোক্তা বলেন, “রাজনৈতিক ত্যাগ অবশ্যই সম্মানের। কিন্তু দায়িত্ব পাওয়ার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কাজের ফলাফল। এক বছরের মধ্যেই মানুষ বুঝতে পারবে তিনি কতটা সফল হয়েছেন।”
নগরবাসী নাসির উদ্দিন,:“আমরা চাই এনডিএতে যেন কোনো ধরনের অনিয়ম বা পক্ষপাতিত্ব না থাকে। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।”
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি সরকার গঠনের পর ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার যে ধারা শুরু হয়েছে, তারই অংশ হিসেবে মাসুকুল ইসলাম রাজীবের নিয়োগ এসেছে। তবে এই নিয়োগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে দায়িত্ব পালনের ওপর।
তাদের ভাষ্য, এনডিএ চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি যদি পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, সেবা সহজীকরণ এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারেন, তাহলে এটি শুধু তার ব্যক্তিগত সাফল্যই হবে না, বরং সরকারের জন্যও একটি ইতিবাচক বার্তা হয়ে উঠবে।
মাসুকুল ইসলাম রাজীবের রাজনৈতিক ত্যাগ ও দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে খুব বেশি বিতর্ক নেই। তবে এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা প্রশাসনিক নেতৃত্বের। এক বছরের দায়িত্বকালে তিনি কতটা দৃশ্যমান উন্নয়ন করতে পারেন, কতটা জনবান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং এনডিএকে কতটা গতিশীল প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে পারেন সেটিই এখন নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রধান প্রত্যাশা।
রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে একজন দক্ষ প্রশাসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে তিনি যেমন জনগণের আস্থা অর্জন করবেন, তেমনি নারায়ণগঞ্জের পরিকল্পিত উন্নয়নেও রাখতে পারবেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এখন সেই প্রত্যাশা পূরণে তার পদক্ষেপের দিকেই তাকিয়ে আছে পুরো নারায়ণগঞ্জ।

