নারায়ণগঞ্জের বর্তমান আদালতপাড়া থেকে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট, নির্বাহী কোর্ট ও জর্জ কোর্ট আলাদা করে অন্যত্র স্থানান্তরের যে কোনো উদ্যোগের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এইচ.এম. আনোয়ার প্রধান। তিনি বলেছেন, আদালতপাড়াকে বিভক্ত করে একটি বা দুটি কোর্ট অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত নারায়ণগঞ্জের আইনজীবীরা মেনে নেবেন না। সব কোর্ট স্থানান্তরের প্রয়োজন হলে তা একসঙ্গে করতে হবে।
ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েনিফোর ডটকমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে অ্যাডভোকেট আনোয়ার প্রধান বলেন, নারায়ণগঞ্জের আদালতপাড়া শুধু আইনজীবীদের কর্মস্থল নয়, এটি জেলার বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষেরও গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা। এখানে দীর্ঘদিন ধরে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট, নির্বাহী কোর্ট ও জর্জ কোর্ট পাশাপাশি কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ফলে কোনো একটি কোর্টকে আলাদা করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হলে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি বাড়বে।
তিনি বলেন, “নারায়ণগঞ্জের কতিপয় আইনজীবী কিছু কোর্ট স্থানান্তরের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এ ধরনের কোনো উদ্যোগ অতীতে সফল হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। আমি এবং আমার পরিষদসহ নারায়ণগঞ্জের সব আইনজীবী এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ। এই আদালত চত্বর থেকে কোনো কোর্ট আলাদা করে অন্যত্র নেওয়ার সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নেব না।”
আনোয়ার প্রধান আরও বলেন, বর্তমানে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট, নির্বাহী কোর্ট এবং জর্জ কোর্ট একই আদালত চত্বরে অবস্থান করছে। আইনজীবীদের জন্য একই জায়গায় সব ধরনের আদালতের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় বিচারিক কাজের সমন্বয়ও সহজ হয়। এ অবস্থায় একটি কোর্টকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হলে নানা ধরনের প্রশাসনিক ও ব্যবহারিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, “কোর্ট স্থানান্তর করতেই হলে সব কোর্ট একসঙ্গে স্থানান্তর করতে হবে। একটি কোর্ট এখানে থাকবে, আরেকটি কোর্ট অন্য জায়গায় যাবে এ ধরনের ব্যবস্থা আইনজীবীরা মেনে নেবেন না। আমরা চাই আদালতের সব কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট ও সমন্বিত জায়গায় থাকুক।”
কোর্ট স্থানান্তরের বিষয়ে সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে আনোয়ার প্রধান বলেন, এখন পর্যন্ত তারা সরকারের কাছ থেকে কোনো আদেশ, নির্দেশনা কিংবা প্রজ্ঞাপন পাননি।
তিনি বলেন, “কোর্ট স্থানান্তর করা হবে এমন কোনো সরকারি আদেশ বা প্রজ্ঞাপন আমাদের কাছে আসেনি। ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট, নির্বাহী কোর্ট ও জর্জ কোর্ট বর্তমানে এখানেই রয়েছে। আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।”
তিনি আরও বলেন, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করা। কারণ আদালতের সঙ্গে আইনজীবীদের সরাসরি পেশাগত সম্পর্ক রয়েছে এবং বিচারপ্রার্থীদের সুবিধা-অসুবিধার বিষয়টিও তাদের বিবেচনায় রাখতে হয়।
কোর্ট স্থানান্তরের বিষয়ে যারা অপচেষ্টা চালাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে আনোয়ার প্রধান বলেন, কিছু আইনজীবী সবসময় নানা ধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকেন। তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আইনজীবী সমাজ অবগত রয়েছে।
তিনি বলেন, “কতিপয় ব্যক্তি সবসময় ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকেন। আমরা তাদের চিহ্নিত করব। প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কেউ যদি কোনো হঠকারী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিজেকে বিতর্কিত করতে চান, তাহলে নারায়ণগঞ্জের বিজ্ঞ আইনজীবীরাই তার যথাযথ মূল্যায়ন করবেন।”
অ্যাডভোকেট আনোয়ার প্রধান জানান, এর আগেও নারায়ণগঞ্জের কোর্ট স্থানান্তরের বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তৎকালীন আইন উপদেষ্টা এবং তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল, যিনি বর্তমানে আইনমন্ত্রী, নারায়ণগঞ্জে এসেছিলেন। সে সময় তাকে ডেকে একটি কোর্ট অন্তত অন্যত্র স্থানান্তরের বিষয়ে মতামত জানতে চাওয়া হয়।
আনোয়ার প্রধান বলেন, “আমি তখন তাদের পরিষ্কারভাবে জানিয়েছিলাম যে নারায়ণগঞ্জের আইনজীবীরা একটি কোর্টও আলাদা করে স্থানান্তরের বিষয়টি মেনে নেবেন না। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শেষে তারা নীতিগতভাবে জানিয়েছিলেন, আপাতত কোর্ট এখানেই থাকুক। তবে ভবিষ্যতের জন্য আমাদের একটি প্রস্তাবনা দিতে বলা হয়েছিল।”
তিনি জানান, তখন বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে সার্কিট হাউজ, সিভিল সার্জনের কার্যালয় এবং পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের জায়গার কথা আলোচনায় এসেছিল। সংশ্লিষ্টরা এসব জায়গা পরিদর্শনও করেছিলেন।
আনোয়ার প্রধান বলেন, “তৎকালীন আইন উপদেষ্টার সঙ্গে বর্তমান আইনমন্ত্রীও ওই সময় এসব জায়গা পরিদর্শন করেছিলেন। আমরা তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি, বর্তমান আদালতপাড়ায় সব কোর্ট একসঙ্গে থাকাটাই বেশি যুক্তিযুক্ত। আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী এবং সংশ্লিষ্ট সবার জন্য একই স্থানে আদালত থাকা সুবিধাজনক।”
তিনি বলেন, আইনজীবীদের পক্ষ থেকে তখনও স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল—যদি সব কোর্ট একসঙ্গে নেওয়ার মতো উপযুক্ত ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে তারা বিষয়টি বিবেচনা করতে প্রস্তুত। কিন্তু একটি কোর্ট এক জায়গায় এবং অন্য কোর্ট অন্য জায়গায় থাকবে—এ ধরনের ব্যবস্থা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আদালতপাড়া বিভক্ত করার মতো কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে আইনজীবীরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রতিবাদ করবেন বলেও জানান আনোয়ার প্রধান।
তিনি বলেন, “আমরা সংঘাত চাই না, আমরা সমাধান চাই। কিন্তু আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা না করে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে আমরা আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করব। নারায়ণগঞ্জের আইনজীবীরা এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ।”
সবশেষে অ্যাডভোকেট এইচ.এম. আনোয়ার প্রধান বলেন, আদালত স্থানান্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো গোপনীয়তা বা ষড়যন্ত্রের সুযোগ নেই। সরকারের পক্ষ থেকে যদি কখনো এমন কোনো পরিকল্পনা নেওয়া হয়, তাহলে আইনজীবী সমিতির সঙ্গে আলোচনা করেই তা করতে হবে।
“নারায়ণগঞ্জের আইনজীবীদের মতামত উপেক্ষা করে আদালতপাড়া বিভক্ত করার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা মেনে নেওয়া হবে না। ষড়যন্ত্রকারীরা কখনোই সফল হতে পারেনি। ভবিষ্যতেও কোনো হীন ষড়যন্ত্র সফল হতে দেওয়া হবে না,”দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন তিনি।

