নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) সীমানা সম্প্রসারণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রাথমিক প্রস্তাবে কাশীপুর ইউনিয়নের ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডকে নাসিকের আওতায় নেওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তী গণশুনানি ও পর্যালোচনার পর জেলা প্রশাসনের চূড়ান্ত মতামতে কাশীপুরকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এর বিপরীতে ফতুল্লা, কুতুবপুর ও এনায়েতনগর ইউনিয়নের পুরো এলাকা নাসিকের আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
এতে কাশীপুরবাসীর মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—কাশীপুর নাসিকের অন্তর্ভুক্ত হলে এলাকার উন্নয়ন ও নাগরিক সেবায় কী পরিবর্তন আসত, আর ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় থাকলে কী ধরনের সুবিধা বজায় থাকবে?
সংশ্লিষ্টদের মতে, কাশীপুরের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে নগরায়ণের প্রভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে নাসিকের আওতায় গেলে সড়ক, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়কবাতি, পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য নগরসেবা সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনার আওতায় আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে শহরের সঙ্গে যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নকে একটি বৃহত্তর নগর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
নগরায়ণের কারণে ভবিষ্যতে কাশীপুরের আবাসিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়লে সিটি করপোরেশনের আওতায় থাকা অনেক ক্ষেত্রে সমন্বিত অবকাঠামো পরিকল্পনায় সহায়ক হতে পারে। তবে নাসিকে অন্তর্ভুক্ত হলেই এসব সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বাস্তবে সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর এসব সেবা নির্ভর করবে।
অন্যদিকে কাশীপুরকে নাসিকের বাইরে রাখারও কিছু সুবিধা রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ইউনিয়নের প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় থাকা। প্রাথমিক প্রস্তাবে কাশীপুরের শুধু ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড নাসিকে নেওয়ার কথা থাকায় স্থানীয়দের একটি অংশ আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে একই ইউনিয়নের একটি অংশ সিটি করপোরেশনের এবং অন্য অংশ ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় চলে যাবে। ফলে কাশীপুরের প্রশাসনিক পরিচয় ও স্থানীয় কাঠামো বিভক্ত হয়ে পড়তে পারে।
ইউনিয়ন হিসেবে থাকলে কাশীপুরের পুরো এলাকা একই স্থানীয় সরকার কাঠামোর অধীনে থাকবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিত্ব, ইউনিয়নভিত্তিক বিভিন্ন সেবা এবং বিদ্যমান প্রশাসনিক পরিচয়ও বজায় থাকবে। বিশেষ করে যেসব বাসিন্দা কাশীপুরকে সম্পূর্ণ একটি ইউনিয়ন হিসেবে রাখার পক্ষে, তাদের কাছে এটিই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তবে ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় থাকলে নগর এলাকার মতো সমন্বিত ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়কবাতি ও অন্যান্য নগরসেবা পাওয়ার কাঠামো আলাদা থাকবে। ফলে কাশীপুরের দ্রুত নগরায়ণ হলে ভবিষ্যতে নাগরিক সেবা ও অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন ও সিটি করপোরেশন—কোন কাঠামো বেশি কার্যকর হবে, সেটিও আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।
এদিকে নাসিকের সীমানা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে শুধু উন্নয়ন নয়, কর ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের বিষয়টিও বিবেচনায় আসতে পারে। সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্তির পর স্থানীয় পর্যায়ে কর কাঠামো, সেবা গ্রহণের পদ্ধতি ও প্রশাসনিক দায়িত্বে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই কাশীপুরের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধু ‘উন্নয়ন হবে কি না’—এই প্রশ্ন নয়, বরং কর, নাগরিক সেবা, প্রশাসনিক পরিচয়, জনপ্রতিনিধিত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কাশীপুরকে নাসিকের বাইরে রাখার সিদ্ধান্তটি এখন জেলা প্রশাসনের চূড়ান্ত মতামত বা সুপারিশের পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ এটি এখনই চূড়ান্তভাবে সিটি করপোরেশনের সীমানা থেকে বাদ পড়ার শেষ সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। পরবর্তী সরকারি প্রক্রিয়ায় বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে।
কাশীপুর নাসিকে যাবে কি না—এ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাই স্থানীয় মানুষের মতামত, এলাকার বর্তমান নগরায়ণ, ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত প্রয়োজন, নাগরিক সেবার মান, করের প্রভাব এবং প্রশাসনিক অখণ্ডতা—সবকিছু বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ প্রশ্নটি শুধু সীমানা পরিবর্তনের নয়; কাশীপুর আগামী দিনে কী ধরনের প্রশাসনিক ও নাগরিক কাঠামোর মধ্যে বিকশিত হবে—মূল বিষয়টি সেখানেই।

