নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে বিএনপি দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সক্রিয়। আন্দোলন-সংগ্রামের সময় রাজপথে দলটির নেতাকর্মীদের দৃশ্যমান উপস্থিতি থাকলেও বর্তমানে সংগঠনের ভেতরে নেতৃত্বের সমন্বয়, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। জেলা ও মহানগর বিএনপির পাশাপাশি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যেও নেতৃত্বের দূরত্ব, গ্রুপিং এবং পদকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
দলীয় নেতাকর্মীদের একাংশের ভাষ্য, কেন্দ্র থেকে দেওয়া কর্মসূচি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আগের মতো সমন্বিত নেতৃত্ব দেখা যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রেই পৃথক বলয় বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক কর্মসূচিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে একই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেই কোথাও কোথাও সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্বে থাকা নেতাদের ঘিরে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা থাকলেও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে তৃণমূলে পৌঁছাচ্ছে এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।
দলীয় কর্মীদের একটি অংশ মনে করেন, শুধু কমিটি গঠন কিংবা শীর্ষ পদে নেতৃত্ব নির্ধারণ করলেই সাংগঠনিক চেইন অব কমান্ড কার্যকর হয় না। ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট কাঠামো প্রয়োজন।
নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন নেতাকে কেন্দ্র করে পৃথক বলয়ের উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা রয়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচি, কমিটি গঠন এবং সাংগঠনিক পদ-পদবি ঘিরে এসব বলয়ের প্রভাবও আলোচনায় আসে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, অনেক সময় সাংগঠনিক যোগ্যতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা ও নিজস্ব বলয়ের বিষয়টি পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে এ ধরনের অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
জেলা ও মহানগর বিএনপির পাশাপাশি যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদলসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। কোথাও কমিটি থাকলেও নিয়মিত সাংগঠনিক কার্যক্রম দৃশ্যমান নয় এমন অভিযোগ রয়েছে তৃণমূলের কিছু নেতাকর্মীর।
আবার নতুন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ায় পুরনো বিরোধ নতুন করে সামনে আসার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা অনেক নেতাকর্মীর প্রত্যাশা ছিল, রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের পর তাদের মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু পদ-পদবি ও সাংগঠনিক স্বীকৃতি নিয়ে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় তৃণমূলের একটি অংশের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে—এমন বক্তব্য বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে।
তাদের প্রশ্ন, যারা কঠিন সময়ে মাঠে ছিলেন, সাংগঠনিক পুনর্গঠনের সময় তাদের ভূমিকা কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে?
রাজনৈতিক সংগঠনে চেইন অব কমান্ডের মূল বিষয় হলো কেন্দ্রীয় বা শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত দ্রুত সাংগঠনিক কাঠামোর মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে পৌঁছানো এবং তা বাস্তবায়ন করা। নারায়ণগঞ্জে সেই প্রক্রিয়ায় কোথায় দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
শীর্ষ নেতাদের কেউ যদি দলীয় সিদ্ধান্ত দেন, সেটি থানা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাদের কাছে কতটা দ্রুত পৌঁছায়? মাঠের নেতারা কি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে একই প্ল্যাটফর্মে থাকেন? নাকি ব্যক্তিগত বলয় অনুযায়ী কর্মসূচি পরিচালিত হয়—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির বর্তমান সাংগঠনিক চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
কমিটি পুনর্গঠন, অঙ্গসংগঠনের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মসূচি সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সামনে এখন সাংগঠনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয় বাড়ে নাকি পুরনো বিভক্তি আরও দৃশ্যমান হয়, সেটিই ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে চেইন অব কমান্ডের প্রশ্নটি কেবল শীর্ষ নেতাদের নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে তৃণমূলের অংশগ্রহণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা, সাংগঠনিক জবাবদিহি এবং মাঠপর্যায়ে নিয়মিত কার্যক্রম।
নারায়ণগঞ্জ বিএনপির বর্তমান বাস্তবতায় তাই মূল প্রশ্ন একটাইদলীয় নেতৃত্ব কি মাঠের নেতাকর্মীদের একই কমান্ডে আনতে পারছে, নাকি ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির কারণে সাংগঠনিক চেইনে তৈরি হচ্ছে দূরত্ব?

