আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই বছর পর নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘রাজনৈতিক পুনর্বাসন’। বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকা কিছু ব্যক্তি এখন বিএনপির কতিপয় নেতার ছত্রছায়ায় থেকে নিজেদের নতুন রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করছেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করে কেউ বিএনপির কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন, কেউ স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করছেন, আবার কেউ বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পরিচয় ব্যবহার করে মাঠে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ‘আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপি’ নয়, বরং বিএনপির কিছু নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তৈরি হচ্ছে ‘নতুন বিএনপি’। আর এই নতুন সমীকরণে সবচেয়ে বেশি হতাশ হচ্ছেন দীর্ঘদিন রাজপথে থাকা বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীরা।
তাদের প্রশ্ন যারা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হয়ে দলের পাশে ছিলেন, তাদের বাদ দিয়ে যদি ক্ষমতার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরাই নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে বিএনপিতে জায়গা করে নেন, তাহলে দীর্ঘদিনের ত্যাগের মূল্য কোথায়?
নারায়ণগঞ্জ দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে জেলার বিএনপির বহু নেতাকর্মী মামলা, হামলা ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে ছিলেন। সরকার পতনের পর বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে মাঠে ফিরলেও আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের বড় একটি অংশ আত্মগোপনে চলে যায়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। তৃণমূলের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সরাসরি রাজনীতি করা কিছু ব্যক্তি এখন নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন। আর এই প্রক্রিয়ায় বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের কিছু নেতার সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতাই হয়ে উঠেছে প্রধান ভরসা।
তৃণমূলের ভাষ্য, আগে যারা আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে থেকে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেন, তাদেরই একটি অংশ এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয়ের মাধ্যমে নিজেদের পুরোনো প্রভাব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। কেউ ব্যবসায়িক সম্পর্ককে কাজে লাগাচ্ছেন, কেউ স্থানীয় প্রভাবশালী বিএনপি নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন, আবার কেউ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বিএনপির পরিচয়ে হাজির হচ্ছেন এমন অভিযোগ রয়েছে।
বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের ক্ষোভের বড় জায়গা এখানেই। তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ আমলে স্থানীয় পর্যায়ে যারা বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছেন, তাদের কাউকে কাউকে এখন বিএনপির নেতাদের পাশে দেখা যাচ্ছে।
তৃণমূলের কয়েকজন নেতাকর্মীর ভাষ্য, রাজনীতির মাঠে যারা দুঃসময়ে ছিলেন না, তারা এখন সুসময়ের সুযোগ নিচ্ছেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে সরাসরি বিএনপির রাজনীতিতে আসতে না পারা ব্যক্তিদের একটি অংশ এখন ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে দলীয় বলয়ের কাছাকাছি চলে আসছেন। এতে একদিকে যেমন পুরোনো বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে দলীয় সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে নারায়ণগঞ্জে ভবিষ্যতে বিএনপির মধ্যে একটি অদৃশ্য বিভাজন তৈরি হতে পারেএকদিকে দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও আন্দোলনকারী নেতাকর্মী, অন্যদিকে রাজনৈতিক পালাবদলের পর নতুন করে দলে সক্রিয় হওয়া ব্যক্তিরা। এই দ্বিতীয় অংশের অনেকেই বিএনপির আদর্শ বা দীর্ঘদিনের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু স্থানীয় কিছু নেতার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তারা দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন।
এমন পরিস্থিতিতে তৃণমূলের প্রশ্ন দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কি রাজপথের কর্মীদের হাতে থাকবে, নাকি অর্থনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবের কারণে নতুন করে জায়গা করে নেওয়া ব্যক্তিদের হাতে চলে যাবে?
নারায়ণগঞ্জে রাজনীতি, ব্যবসা ও স্থানীয় প্রভাবের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব ধরে রাখার অভিযোগ অতীতেও বিভিন্ন সময়ে উঠেছে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই পুরোনো প্রবণতাই এবার নতুন পরিচয়ে ফিরে আসার চেষ্টা করছে।
তাদের দাবি, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকা কারও বিএনপির রাজনীতিতে আসার বিষয়টি শুধু বর্তমান রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। তার অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা, স্থানীয় কর্মকাণ্ড, ব্যবসায়িক প্রভাব এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ধরন যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে যাদের বিরুদ্ধে হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখল, নির্যাতন কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ বা মামলা রয়েছে, তাদের বিষয়ে দলীয়ভাবে সতর্ক অবস্থান নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতার অভিযোগের বিপরীতে বিএনপির স্থানীয় শীর্ষ নেতাদের কঠোর বক্তব্যও রয়েছে।
২০২৬ সালের ২২ জুন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান প্রকাশ্যে বলেন, আওয়ামী লীগকে তাদের অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হবে এবং আইন অনুযায়ী শাস্তি ভোগ করতে হবে। তবে তৃণমূলের অভিযোগ, এই দ্বৈত বাস্তবতাই এখন বিএনপির তৃণমূলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ বেড়েছে। এই সুযোগে দীর্ঘদিনের দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় থেকে আসা ব্যক্তিরাও নিজেদের জায়গা তৈরি করছেন।
তাদের ভাষায়, ‘যে সময় বিএনপির নেতাকর্মীরা রাজপথে ছিল, তখন তারা কোথায় ছিলেন—সেটিও রাজনৈতিক মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত।’
তৃণমূলের দাবি, শুধু বিএনপির কোনো নেতার সঙ্গে ছবি তোলা, মিছিল-মিটিংয়ে উপস্থিত হওয়া কিংবা স্থানীয় কোনো নেতার সুপারিশে পরিচয় পাওয়া মানেই বিএনপির রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া নয়।
বরং একজন ব্যক্তি কতদিন ধরে দলের সঙ্গে আছেন, দুঃসময়ে কী ভূমিকা রেখেছেন, তার রাজনৈতিক অতীত কী এবং স্থানীয় জনগণের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মনে করছেন, এখনই দলীয়ভাবে যাচাই-বাছাই শুরু না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
তাদের দাবি, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়া থাকা দরকার। একই সঙ্গে কোনো নেতার ব্যক্তিগত সুপারিশ বা সম্পর্কের ভিত্তিতে কাউকে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক অবস্থানে আনার বিষয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
তৃণমূলের ভাষায়, বিএনপিকে শক্তিশালী করতে হলে ‘নতুন বিএনপি’ তৈরি নয়, বরং পুরোনো ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করতে হবে।
নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ক্ষমতার পালাবদলের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ তৈরির ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক পরিচয় গ্রহণের ক্ষেত্রে অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা এবং বর্তমান কর্মকাণ্ড যাচাই না করা হলে ভবিষ্যতে দলটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিরোধ তৈরি হতে পারে।
বিএনপির তৃণমূলের সামনে এখন তাই দুটি বড় প্রশ্ন—আওয়ামী লীগের পুরোনো রাজনৈতিক প্রভাবকে কীভাবে ঠেকানো হবে এবং একই সঙ্গে নিজেদের দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের আস্থা কীভাবে ধরে রাখা হবে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাজপথে থাকা বিএনপির কর্মীদের পাশ কাটিয়ে যদি ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে অভ্যস্ত ব্যক্তিরা নতুন পরিচয়ে সামনে চলে আসেন, তাহলে দলের ভেতরে হতাশা আরও বাড়বে।
শেষ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও প্রভাবের রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক আদর্শ এবং ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন কতটা নিশ্চিত করা যায়।
‘আওয়ামী লীগ থেকে নতুন বিএনপি’ নারায়ণগঞ্জে তৃণমূলে ক্ষোভ ও হতাশা
Leave a Comment

