নারায়ণগঞ্জ মহানগর যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন আনুর মৃত্যুর দুই বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট রাতে শহরের মাসদাইর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠের পশ্চিম পাশে হেলেনা সেঞ্চুরি অ্যাপার্টমেন্টের লিফটের ফাঁকা জায়গা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। শুরু থেকেই ঘটনাটি নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। নিহতের পরিবারের দাবি, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু বা দুর্ঘটনা নয়; আনুকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে মরদেহ লিফটের ফাঁকা জায়গায় ফেলে রাখা হয়েছিল।
মৃত্যুর দুই বছর পরও মামলার বিচারিক নিষ্পত্তি না হওয়ায় নিহতের স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে। এদিকে মামলার এজাহারে নাম থাকা কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও পরবর্তীতে জামিনে মুক্ত হয়েছেন। ফলে প্রকৃত হত্যাকারী কারা এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী কারণ ছিল এ প্রশ্ন এখনো আলোচনায়।
২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট দুপুর থেকে নিখোঁজ ছিলেন আনোয়ার হোসেন আনু। রাতে মাসদাইর এলাকার হেলেনা সেঞ্চুরি অ্যাপার্টমেন্টের লিফটের ফাঁকা জায়গায় তার মরদেহ দেখতে পাওয়া যায়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। আনু ওই ভবনের নবম তলায় ছেলে-মেয়েকে নিয়ে বসবাস করতেন। তিনি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মনিরুজ্জামান মনিরের ছোট ভাই এবং মহানগর যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি ছিলেন।
ঘটনার পর পুলিশ নিহতের ছেলে-মেয়ে ও শ্বশুরবাড়ির স্বজনসহ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে। পরে তাদের কয়েকজনকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
পরদিন, ২৭ আগস্ট, নিহতের বড় ভাই আবুল কাশেম বাদশা বাদী হয়ে ফতুল্লা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ফতুল্লা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব রাসেল মাহমুদকে প্রধান আসামি করা হয়। এছাড়া আনুর সাবেক স্ত্রী পাপিয়া আক্তার পান্না, ছেলে সারিদ হোসেন, মেয়ে জান্নাত আরা জাহান প্রেরণা, নূর আলম, কাজল, রোকসানা আক্তার পুতুল ও গোল মোহাম্মদসহ আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, আনুর সাবেক স্ত্রী পাপিয়া আক্তার পান্নার সঙ্গে রাসেল মাহমুদের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে আগে থেকেই পারিবারিক বিরোধ ছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়, সম্পত্তি ও অর্থনৈতিক বিষয় নিয়েও আনুর সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরোধ চলছিল এবং তাকে বিভিন্ন সময় হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এসব বিরোধের জেরেই পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।
তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। মামলায় আসামি হওয়া মানেই কোনো ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়।
মামলা দায়েরের পর পুলিশ নিহতের ছেলে-মেয়ে, সাবেক স্ত্রীর পরিবারের সদস্যসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায়। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ছিলেন নূর আলম, রোকসানা আক্তার পুতুল, সারিদ হোসেন, কাজল ও জান্নাত আরা জাহান প্রেরণা। আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এ সময় মামলার প্রধান আসামি হিসেবে উল্লেখ করা রাসেল মাহমুদ পলাতক ছিলেন। পরে মামলার তদন্তভার পিবিআইয়ের কাছে যায় এবং তদন্তে প্রযুক্তিগত তথ্য ও ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত বিশ্লেষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ঘটনার প্রায় আড়াই মাস পর, ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর ঢাকার শাহবাগ এলাকা থেকে রাসেল মাহমুদ ও তার স্ত্রী পাপিয়া আক্তার পান্নাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পরদিন আদালত রাসেলকে দুই দিনের এবং পাপিয়াকে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
পিবিআইয়ের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়েছিল, ঘটনার পর ক্রাইমসিন টিম ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় জড়িতদের শনাক্তের কাজ শুরু করে।
মামলার বাদী ও নিহতের স্বজনদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে পারিবারিক বিরোধ, সাবেক স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক এবং সম্পত্তি-অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব।
অন্যদিকে মামলার প্রধান আসামি রাসেল মাহমুদ জামিনে মুক্ত হওয়ার পর দাবি করেন, আনুর সঙ্গে তার ভাইদের জমি নিয়ে বিরোধ ছিল এবং সেই বিরোধের জেরেই আনু হত্যার শিকার হয়ে থাকতে পারেন। তিনি নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল বলেও দাবি করেছেন।
আনুর মেয়ে প্রেরণার বক্তব্যও মামলার অভিযোগের সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়। তার দাবি ছিল, তার বাবা মাদকসেবী ছিলেন এবং পারিবারিক কলহের কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন।
অর্থাৎ, আনুর মৃত্যুর কারণ ও হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য নিয়ে শুরু থেকেই একাধিক পরস্পরবিরোধী বক্তব্য রয়েছে।
মামলার প্রধান আসামি রাসেল মাহমুদ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হন। তখন তিনি বলেন, মামলাটি বিচারাধীন হওয়ায় এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে চান না। একই সময়ে তিনি আনু হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মামলার আট আসামির মধ্যে সাতজনই ২০২৫ সালের জানুয়ারির মধ্যে জামিনে মুক্ত হন।
আরও সাম্প্রতিক সময়ে, ২০২৬ সালের এপ্রিলে আনু হত্যা মামলার বাদী ও নিহতের বড় ভাই আবুল কাশেম বাদশাকে অন্য একটি মামলায় পুলিশে তুলে দেওয়ার ঘটনাও সামনে আসে। ওই ঘটনার বিষয়ে বাদীর পরিবারের দাবি, আনু হত্যা মামলার প্রধান আসামি রাসেল মাহমুদের অনুসারীরা তাকে পথরোধ করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এই অভিযোগও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য হিসেবে এসেছে; এর স্বাধীন বিচারিক সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
আনু হত্যাকাণ্ডের দুই বছর পূর্তিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ঠিক কীভাবে আনু মারা গেলেন এবং কারা তাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে মরদেহ ফেলে রাখল?
এর সঙ্গে আরও কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে মৃত্যুর আগে আনু কার সঙ্গে ছিলেন? তিনি কীভাবে ভবনের লিফটের ফাঁকা জায়গায় গেলেন? এটি দুর্ঘটনা হলে কীভাবে তিনি সেখানে পড়ে গেলেন এবং যদি হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে, তাহলে কারা তাকে সেখানে নিয়ে গেল? মামলার এজাহারে যাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ রয়েছে, তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা তদন্তে কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে? পারিবারিক বিরোধ, সম্পত্তি কিংবা অন্য কোনো কারণ—কোনটি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত মোটিভ? পিবিআইয়ের তদন্তে ঘটনাস্থলের আলামত ও প্রযুক্তিগত তথ্য থেকে কী পাওয়া গেছে? দুই বছর পর মামলার তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম কোন পর্যায়ে রয়েছে? এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর আদালতের বিচার ও তদন্তের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে।
আনুর পরিবারের দাবি, একজন মানুষকে হারানোর পর দুই বছর ধরে তারা শুধু স্বজন হারানোর যন্ত্রণা নয়, হত্যার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের অপেক্ষাতেও রয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, প্রভাবশালী কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
নিহতের স্বজন ও স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরাও বিভিন্ন সময়ে আনু হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন।
২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট রাতের সেই ঘটনা এখনো আনুর পরিবারের কাছে একটি অমীমাংসিত অধ্যায়। মামলা হয়েছে, আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে, রিমান্ড হয়েছে, আবার জামিনও হয়েছে কিন্তু পরিবারের প্রশ্নের পুরো উত্তর এখনো মেলেনি।
আনু কি হত্যার শিকার হয়েছিলেন, নাকি তার মৃত্যু অন্য কোনোভাবে হয়েছিল—এর চূড়ান্ত সত্য বেরিয়ে আসাই এখন সবচেয়ে বড় দাবি।
দুই বছর পর নিহতের পরিবারের একটাই প্রত্যাশা প্রভাব নয়, পরিচয় নয়; তদন্তে বেরিয়ে আসুক প্রকৃত সত্য এবং আদালতের মাধ্যমে নিশ্চিত হোক ন্যায়বিচার।

