নারায়ণগঞ্জসহ দেশের নগর এলাকায় ভবনের নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও ভোগান্তি কমাতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) মাধ্যমে যেকোনো প্ল্যান বা ভবন নির্মাণের নকশা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হবে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৪ কার্যদিবসের মধ্যে সেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ওয়ানস্টপ সার্ভিস আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নারায়ণগঞ্জ নগরীর খানপুরে নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনডিএ) কার্যালয় উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান।
মন্ত্রী বলেন, নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে নাগরিকদের যেন বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। এক জায়গা থেকে আবেদন গ্রহণ, সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রয়োজনীয় যাচাই এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এতে নাগরিকদের সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের সব উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে অনলাইনে ভবনের নকশা অনুমোদন কার্যক্রম চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ১ জুন মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতি পর্যালোচনা সভায় সিদ্ধান্ত হয়, আগামী ছয় মাসের মধ্যে রাজউকের আদলে অন্যান্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষেও অনলাইন নকশা অনুমোদন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এর জন্য রাজউকের বিদ্যমান সফটওয়্যার ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে।
বর্তমানে রাজউকে ওয়ানস্টপ সার্ভিস (ওএসএস) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভবন নির্মাণের অনুমোদন অনলাইনে দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, এ সেবার নির্ধারিত সময়সীমা ২৪ কার্যদিবস। একই ব্যবস্থার সঙ্গে ইলেকট্রনিক কনস্ট্রাকশন পারমিট সিস্টেমের (ইসিপিএস) মাধ্যমে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রও অনলাইনে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
এর আগে ভবন নির্মাণের অনুমোদন পেতে আবেদনকারীদের একাধিক দপ্তরের অনুমোদন ও অনাপত্তিপত্র সংগ্রহ করতে হতো। ফলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন দপ্তরে যাতায়াত করতে হতো। নতুন অনলাইন ব্যবস্থার লক্ষ্য হচ্ছে এসব ধাপকে সমন্বিত করে আবেদন ও অনুমোদন প্রক্রিয়াকে সহজ করা।
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে রাজউকের নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালুর উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আলাদাভাবে যাওয়ার পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকেই আবেদন গ্রহণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হবে। এ উদ্যোগে মন্ত্রী ও রাজউক চেয়ারম্যান সম্মতি দিয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনডিএ) গঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো নারায়ণগঞ্জ শহর ও আশপাশের এলাকার অপরিকল্পিত নগরায়ন নিয়ন্ত্রণ এবং পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। চলতি বছরের এপ্রিলে জাতীয় সংসদে নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল-২০২৬ পাস হয়। বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন।
এরপর জুনে নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে মাসুকুল ইসলাম রাজীবকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২৬-এর ৮(১) ধারার আওতায় এ নিয়োগের কথা জানানো হয়।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এনডিএ নগরীর ভবন ও নির্মাণ কার্যক্রমে অনুমোদিত নকশা অনুসরণ, পার্কিং ব্যবস্থা এবং অপরিকল্পিত নির্মাণের বিষয়ে নজরদারি শুরু করেছে। গত আগস্টে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পার্কিংবিহীন ভবন ও অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মিত স্থাপনা পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
অনলাইন ও ওয়ানস্টপ পদ্ধতিতে নকশা অনুমোদনের ফলে আবেদনকারীদের সরাসরি বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে যোগাযোগের প্রয়োজন কমতে পারে। একই সঙ্গে আবেদনের অগ্রগতি অনলাইনে পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হলে অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।
তবে ২৪ কার্যদিবসের মধ্যে অনুমোদন পেতে হলে আবেদনকারীর জমির কাগজপত্র, ভূমি ব্যবহার, নকশা, কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য শর্ত যথাযথভাবে পূরণ করতে হবে। কারণ অনুমোদনযোগ্য নয় এমন নকশা বা অসম্পূর্ণ কাগজপত্রের ক্ষেত্রে শুধু সময়সীমা নির্ধারণ করলেই অনুমোদন নিশ্চিত হবে না।
সরকারের নতুন উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে একদিকে অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করা, অন্যদিকে নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা, নিরাপত্তা ও নগর ব্যবস্থাপনার নিয়ম মানা নিশ্চিত করা। রাজউকে চালু থাকা ২৪ কার্যদিবসের অনলাইন অনুমোদন ব্যবস্থার আদলে দেশের অন্যান্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষেও এ সেবা চালু হলে ভবন নির্মাণের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা কমার সুযোগ তৈরি হবে।
নারায়ণগঞ্জের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ নতুন এনডিএর মাধ্যমে নগরীর ভবন নির্মাণ, ভূমি ব্যবহার ও পরিকল্পিত নগরায়ন ব্যবস্থাপনায় একটি পৃথক কর্তৃপক্ষ কার্যকর হয়েছে। ফলে অনলাইন নকশা অনুমোদন ও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হলে নারায়ণগঞ্জের নির্মাণ খাতে অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও কাঠামোবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে

