নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ঝটিকা মিছিল। কয়েকদিনের ব্যবধানে নারায়ণগঞ্জ শহর ও রূপগঞ্জে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের ব্যানারে মিছিলের ঘটনা সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে এগুলো কি বিচ্ছিন্নভাবে নেতাকর্মীদের তৎপরতা, নাকি সংগঠনটি গোপনে আবারও মাঠে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে?
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের প্রকাশ্য সাংগঠনিক প্রত্যাবর্তনের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে একই জেলার একাধিক এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে মিছিলের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে এসেছে। ফলে বিষয়টি নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি সমন্বিত তৎপরতার অংশ তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর ভোরে নারায়ণগঞ্জ শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে ‘নারায়ণগঞ্জ মহানগর যুবলীগ’ লেখা ব্যানারে একটি ঝটিকা মিছিল হয়। পুলিশ জানায়, বলাকা ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে মিছিলটি বের হয়ে কালিরবাজার ব্যাংকের মোড় পর্যন্ত যায়। মিছিলে অংশ নেওয়া কয়েকজনের মাথায় সাদা ক্যাপ ও মুখে মাস্ক ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে অংশগ্রহণকারীদের শনাক্তের চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছিল।
এর কয়েকদিন পর ১৮ সেপ্টেম্বর রূপগঞ্জে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নামে আরেকটি ঝটিকা মিছিল করে ।এদিকে ১৮ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ শহরের ইসদাইর এলাকায়ও যুবলীগের ব্যানারে আরেকটি মিছিল বের করে।
একাধিক স্থানে মিছিল হওয়ায় রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা তৈরি হলেও ঘটনাগুলোকে এখনই আওয়ামী লীগের সাংগঠনিকভাবে পূর্ণাঙ্গ প্রত্যাবর্তন হিসেবে চিহ্নিত করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। কারণ, এখন পর্যন্ত ঘটনাগুলো মূলত স্বল্প সময়ের ঝটিকা মিছিলকেন্দ্রিক।
অন্যদিকে মিছিলগুলোতে অংশগ্রহণকারীদের মুখে মাস্ক ও মাথায় ক্যাপ থাকার মতো বিষয়গুলো থেকে বোঝা যায়, অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের পরিচয় আড়াল রাখার চেষ্টা করেছেন ।
একটি মিছিলের পর কয়েকদিনের ব্যবধানে একই ধরনের আরেকটি মিছিল সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ১৪ সেপ্টেম্বর শহরের বঙ্গবন্ধু সড়ক এবং পরবর্তী সময়ে ইসদাইর ও রূপগঞ্জে মিছিলের খবর আসায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এখন শুধু একটি ঘটনা নয়, একাধিক ঘটনার যোগসূত্রও খতিয়ে দেখতে হচ্ছে।
এর আগে আগস্টেও নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় আওয়ামী লীগের ব্যানারে মিছিলের প্রস্তুতির অভিযোগে কয়েকজনকে আটক ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছিল। ১৩ আগস্ট ঢাকায় ১৫ আগস্টের কর্মসূচির প্রস্তুতি সভা থেকে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিটের যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ৫৩ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার করা হয়।
ফলে কয়েক মাস ধরে বিচ্ছিন্নভাবে নেতাকর্মীদের তৎপরতার ঘটনা সামনে আসছে এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এসব ঘটনার মধ্যে কেন্দ্রীয় বা জেলা পর্যায়ের সমন্বিত সাংগঠনিক নির্দেশনা ছিল কি না, তা প্রকাশ্য তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের প্রজ্ঞাপনে আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী, ভ্রাতৃপ্রতিম ও অঙ্গসংগঠনের সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। এর আওতায় মিছিল, সভা, সমাবেশ, সম্মেলন এবং প্রচার-প্রচারণার মতো কর্মকাণ্ডও রয়েছে। ২০২৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট ওই নিষেধাজ্ঞার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা একটি রিট আবেদন খারিজ করে দেয়; আদালতের সিদ্ধান্তটি অবশ্য নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে চূড়ান্ত সাংবিধানিক রায় নয়, বরং আবেদনটি যথাযথভাবে উপস্থাপিত না হওয়ার ভিত্তিতে খারিজ করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানিয়েছেন।
অর্থাৎ বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি আইনগতভাবে নিষিদ্ধ থাকা অবস্থাতেই এসব ঝটিকা মিছিলের ঘটনা ঘটছে।
নারায়ণগঞ্জে সাম্প্রতিক মিছিলগুলোর পর পুলিশের পক্ষ থেকে অংশগ্রহণকারীদের শনাক্ত করার কথা জানানো হয়েছে। গত কয়েকদিনের মিছিলের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি সাজেদুর রহমান জানিয়েছিলেন, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে মিছিলকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে এবং শনাক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের প্রকাশ্য রাজনীতি নিষিদ্ধ। ফলে প্রকাশ্য বড় সমাবেশের পরিবর্তে স্বল্প সময়ের ঝটিকা মিছিলই দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের মিছিলের মাধ্যমে সংগঠনের উপস্থিতির জানান দেওয়া সম্ভব হলেও এটিকে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে প্রকাশ্য মাঠে ফিরে আসার সমতুল্য বলা যায় না।
তবে একই সঙ্গে বারবার এমন কর্মসূচি হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক উত্তেজনার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পনগরীতে ছোট পরিসরের কর্মসূচিও দ্রুত আলোচনায় চলে আসে।
আগামী দিনে যদি বিভিন্ন উপজেলা ও নগর এলাকায় একই ধরনের কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে দেখা যায়, তাহলে সংগঠনের মাঠপর্যায়ের যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠবে। আর যদি বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনার পর এমন তৎপরতা থেমে যায়, তাহলে এগুলোকে স্থানীয় পর্যায়ের বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ হিসেবে দেখার যুক্তি শক্তিশালী হবে। এই মুহূর্তে তাই নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলকে ‘সংগঠিত প্রত্যাবর্তন’ বা ‘নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ কোনো একটিতে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার আগে আরও তথ্য ও ধারাবাহিকতা দেখা প্রয়োজন।

