দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো নারায়ণগঞ্জেও অনলাইন জুয়ার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শহরের চাষাঢ়া থেকে শুরু করে সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা, বন্দর, রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন এলাকায় মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তরুণদের অনলাইন বেটিংয়ে যুক্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে এ প্রবণতা সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই বন্ধুদের মাধ্যমে প্রথমে বেটিংয়ের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন বিজ্ঞাপন, লিংক কিংবা গ্রুপের মাধ্যমে জুয়ার প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করছে।
প্রথম দিকে কয়েকশ টাকা দিয়ে শুরু হলেও একপর্যায়ে অনেকে হাজার হাজার টাকা পর্যন্ত হারাচ্ছে। পরিবারের অজান্তে টাকা নেওয়া, বন্ধুদের কাছ থেকে ধার করা কিংবা অন্যভাবে অর্থ সংগ্রহ করে জুয়ায় বিনিয়োগের ঘটনাও ঘটছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এতে শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, পড়াশোনা, কর্মজীবন ও পারিবারিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানও হয়েছে। চলতি বছরের ৫ মে শহরের চাষাঢ়া এলাকায় অনলাইন জুয়া খেলার অভিযোগে অভিযান চালিয়ে দুজনকে আটক করে র্যাব-১১। র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের আটক করে।
এরপর অনলাইন জুয়া শুধু খেলোয়াড় পর্যায়েই নয়, এর সঙ্গে যুক্ত অর্থ লেনদেন ও সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধেও অভিযান চালানো হয়েছে। গত ১৫ জুন নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে অনলাইন জুয়া ও অবৈধ অর্থপাচার চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তদন্তে অনলাইন বেটিং সাইট, অর্থ লেনদেন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়ও সামনে আসে।
সিআইডির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অনলাইন বেটিং সাইটের পরিচালনাকারী, এজেন্ট, অর্থ লেনদেনে ব্যবহৃত মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ব্যাংক হিসাবের মালিক এবং দেশি-বিদেশি সহযোগীদের শনাক্তে কাজ চলছে।
অর্থাৎ বিষয়টি এখন শুধু ‘জুয়া খেলা’র মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা, এজেন্ট নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল লেনদেন এবং অর্থপাচারের মতো গুরুতর অপরাধ।
অনলাইন জুয়ার বিস্তার ঠেকাতে চলতি বছর সরকার ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ কার্যকর করেছে। আইনে অনলাইন জুয়া, অনলাইন বেটিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুয়া বা বেটিং গ্রুপ পরিচালনা, অনলাইন জুয়ার অ্যাকাউন্ট পরিচালনা এবং জুয়ার উদ্দেশ্যে অর্থ জমা বা স্থানান্তরের মতো কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী অনলাইন জুয়া বা দূরবর্তী জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত হলে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
এ ছাড়া জুয়া প্রতিরোধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আইন প্রয়োগ, সমন্বয় ও তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ওপর রাখা হয়েছে প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল অবকাঠামো তদারকি এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো এর সহজলভ্যতা। আগে জুয়া খেলতে নির্দিষ্ট স্থানে যেতে হতো। এখন একটি স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই ঘরে বসে জুয়ার প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করা সম্ভব।
ফলে অভিভাবকদের চোখের আড়ালে কিশোর-তরুণরা এতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। শুরুতে জিতলে তাদের মধ্যে আরও অর্থ বিনিয়োগের আগ্রহ তৈরি হয়। পরবর্তীতে হারতে শুরু করলে সেই টাকা উদ্ধারের আশায় তারা আরও বড় ঝুঁকি নেয়। এভাবেই অনেকের মধ্যে আসক্তি তৈরি হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জের সচেতন নাগরিকরা বলছেন, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই এ সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। অনলাইন জুয়ার বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা বন্ধের পাশাপাশি বেটিং এজেন্টদের শনাক্ত করা, সন্দেহজনক ডিজিটাল লেনদেন নজরদারিতে আনা এবং কিশোর-তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও সন্তানদের মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও অনলাইন জুয়ার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা জরুরি।
নারায়ণগঞ্জে ইতোমধ্যে র্যাব ও সিআইডির অভিযান প্রমাণ করছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরেও বিষয়টি এসেছে। তবে স্থানীয়দের মতে, অনলাইন জুয়ার মূল হোতা, এজেন্ট ও অর্থ লেনদেনের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে নারায়ণগঞ্জে এ প্রবণতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
নইলে মোবাইলের ছোট পর্দায় শুরু হওয়া এই ‘ডিজিটাল জুয়া’ একসময় বড় সামাজিক সংকট হয়ে দাঁড়াতে পারে—যার সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে দেশের কিশোর ও তরুণ প্রজন্ম।

