নারায়ণগঞ্জ শহরকে হকারমুক্ত করার ঘোষণা নতুন কোনো বিষয় নয়। বছরের পর বছর ধরে নগরীর বঙ্গবন্ধু সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ করেছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক), জেলা প্রশাসন ও পুলিশ। কিন্তু উচ্ছেদের কিছুদিন পরই আবারও ফুটপাত দখল করে বসেছেন হকাররা। ফলে দীর্ঘদিনের এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
সর্বশেষ ২০২৬ সালে নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের নেতৃত্বে জোরালোভাবে হকার উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলেও একপর্যায়ে নাসিকের উচ্ছেদ কর্মীদের সঙ্গে হকারদের সংঘর্ষ, কর্মীদের আহত হওয়া এবং মামলা পর্যন্ত গড়ায়। এরপরই হকারদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয় সিটি করপোরেশন। এতে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে হকার উচ্ছেদে প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান কি শেষ পর্যন্ত হকারদের প্রতিরোধের মুখে অবস্থান বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন, নাকি পুনর্বাসনের মাধ্যমে সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানের পথে এগোচ্ছেন?
২০২৬ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর শহরকে যানজট ও হকারমুক্ত করার বিষয়ে জোরালো অবস্থান নেন অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান।
৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য, নাসিক প্রশাসক, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও র্যাব-১১-এর প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে বিবি রোডে হকার, অবৈধ দখলদার ও অননুমোদিত পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৩ এপ্রিল থেকে অভিযান শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়।
নাসিকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ফুটপাত হকার ও অবৈধ দখলদারদের দখলে থাকায় পথচারীদের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি সড়কে যানবাহন চলাচলেও তৈরি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা। এ কারণে সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, পুলিশ, র্যাব, আনসারসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর ধারাবাহিকতায় ১৩ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু সড়ক, নবাব সলিমুল্লাহ সড়ক ও শায়েস্তা খাঁ সড়কে সম্মিলিতভাবে হকার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়।
অভিযানে নাসিক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সিটি প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান তখন নারায়ণগঞ্জকে ‘গ্রিন ও ক্লিন’ শহর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য তুলে ধরেন। সেদিন বড় ধরনের কোনো সংঘর্ষ হয়নি। অভিযানের আগেই অনেক হকার তাদের মালামাল সরিয়ে নেওয়ায় উচ্ছেদকারীদের বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়নি। অভিযানের পর শহরের ফুটপাতও অনেকটাই ফাঁকা হয়ে যায়।
১৩ এপ্রিলের অভিযানের কয়েকদিন পর থেকেই বিভিন্ন স্থানে আবার ফুটপাতে বসার চেষ্টা শুরু করেন হকারদের একটি অংশ। উচ্ছেদের পরও তাদের পক্ষ থেকে দেনদরবার ও আন্দোলন চলতে থাকে।
প্রশাসনের ব্যাপক প্রস্তুতি, রাজনৈতিক নেতাদের অংশগ্রহণ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে বড় অভিযান হলেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতি ফের উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এরই মধ্যে ৪ মে চাষাঢ়া এলাকায় নাসিকের উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে হকারদের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় নাসিকের দুই কর্মচারী রুহুল আমিন ও জাহাঙ্গীরসহ অন্তত পাঁচজন আহত হন। হামলার সময় মোবাইল ফোন, মানিব্যাগসহ বিভিন্ন জিনিস নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও ওঠে।
নাসিকের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, উচ্ছেদ অভিযানের সময় হকাররা কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। তবে হকার নেতারা এ অভিযোগ অস্বীকার করেন। হকার নেতা মিজানুর রহমান রনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, প্রকৃত হকাররা মারধরের সঙ্গে জড়িত নন।
৪ মে’র সংঘর্ষের পর বিষয়টি আরও বড় আকার নেয়। ৫ মে রাতে নাসিকের আইন কর্মকর্তা মুহাম্মদ মিজানুর রহমান নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় অভিযোগ করেন।
মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে আরও প্রায় ১৫০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। অর্থাৎ মোট প্রায় ১৬০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এজাহারে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা এবং নাসিকের উচ্ছেদ কর্মীদের আহত করার অভিযোগ আনা হয়।
একদিকে নগর প্রশাসনের বক্তব্য—ফুটপাত পথচারীদের জন্য। অন্যদিকে হকারদের দাবি—ফুটপাতই তাদের জীবিকার প্রধান জায়গা। পুনর্বাসন ছাড়া তাদের উচ্ছেদ করা হলে তারা কোথায় যাবেন, সেটিই তাদের প্রধান প্রশ্ন।
নারায়ণগঞ্জের হকার সমস্যা নতুন নয়। ২০১৮ সালেও হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে নগরীতে বড় ধরনের উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। তখনও হকারদের পুনর্বাসনের বিষয়টি সামনে আসে।
তৎকালীন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী হকারদের জন্য বিকল্প জায়গার ব্যবস্থা করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছিলেন। সেই সময় নগরীতে হকারের সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি বলে আলোচনা ছিল।
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেই এবার নাসিক বুঝতে পারছে, শুধু উচ্ছেদ করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তাই প্রায় এক হাজার হকারের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নাসিকের সাতটি টিম বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে হকারদের জাতীয় পরিচয়পত্রসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেছে। চাষাঢ়া, কালীরবাজার, ডিআইটি ও আশপাশের এলাকার হকারদের তথ্য সংগ্রহ করে তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে চাষাঢ়া থেকে ২ নম্বর রেলগেট পর্যন্ত রেললাইনসংলগ্ন এলাকায় হকারদের বসানোর পরিকল্পনার কথা জানা গেছে। নাসিকের পরিকল্পনায় প্রথমে সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা হকারদের এবং পরে জেলার অন্যান্য এলাকার হকারদের পুনর্বাসনের কথা বলা হয়েছে।
এমনকি ভবিষ্যতে চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটে বহুতল ভবন নির্মাণ করে সেখানে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকৃত হকারদের পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া হবে। তবে দেশের অন্য এলাকা থেকে এসে নারায়ণগঞ্জের সড়ক ও ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হবে না।
সরাসরি এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং ১৩ এপ্রিলের অভিযান এবং পরবর্তী পুনর্বাসন উদ্যোগ—দুটিই বলছে, নাসিক একদিকে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে চাইছে, অন্যদিকে হকারদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় নিচ্ছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ১৩ এপ্রিলের বড় অভিযানের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই হকারদের পুনরায় বসার চেষ্টা এবং ৪ মে উচ্ছেদ অভিযানে নাসিক কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করেছে।
আর এখানেই বড় পরীক্ষা প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খানের।
তিনি কি শুধু অভিযান চালিয়ে সাময়িকভাবে ফুটপাত খালি রাখতে পারবেন, নাকি পুনর্বাসন, নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে শহরের ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে পারবেন—এখন সেটিই দেখার বিষয়।
নারায়ণগঞ্জের হকার সমস্যা এখন আর শুধু ফুটপাত দখলের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবিকা, পুনর্বাসন, রাজনৈতিক প্রভাব, নগর ব্যবস্থাপনা, যানজট এবং প্রশাসনের সক্ষমতার প্রশ্ন।
অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে হকারদের সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হলেও তাদের স্থায়ীভাবে অন্যত্র সরিয়ে রাখা যায়নি। ফলে কিছুদিন পরই আবারও ফুটপাত দখলের পুরোনো চিত্র ফিরে এসেছে।
২০২৬ সালে সাখাওয়াত হোসেন খানের নেতৃত্বে নতুন করে বড় ধরনের অভিযান এবং পরবর্তী সময়ে হকারদের তালিকা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ এবারের পরিস্থিতিকে কিছুটা ভিন্ন করে তুলেছে।
প্রায় এক হাজার হকারের তালিকা তৈরি ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এর পাশাপাশি ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত নজরদারি এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত কঠোর প্রয়োগও প্রয়োজন।
কারণ শুধু উচ্ছেদ নয় পুনর্বাসন, নিয়মিত নজরদারি ও আইন প্রয়োগ এই তিনটি একসঙ্গে কার্যকর না হলে নারায়ণগঞ্জের হকার সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
এখন দেখার বিষয়, প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান শেষ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ শহরকে হকারমুক্ত রাখতে পারেন, নাকি নগরবাসীর বহু বছরের পুরোনো সেই চিত্রই আবার ফিরে আসে ‘উচ্ছেদ হবে, হকার ফিরবে।’

