নারায়ণগঞ্জে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের আকস্মিক মিছিল নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে শহর ও বন্দরের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ঝটিকা মিছিল ও শোডাউনের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা কি আবারও মাঠে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমানে স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপি নিজেদের সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সেই সুযোগে নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর কিছু নেতাকর্মী সীমিত পরিসরে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা করছেন। যদিও এসব মিছিল কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী হয় না এবং অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাও তুলনামূলক কম।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকায় বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, ঝটিকা মিছিলগুলো পরিকল্পিতভাবে এমন সময়ে করা হয়, যখন এলাকায় নজরদারি তুলনামূলক কম থাকে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই ওসমান পরিবারের নতুন প্রজন্ম হিসেবে পরিচিত আজমেরী ওসমানের নাম বিভিন্ন কর্মসূচির সঙ্গে জড়িয়ে আলোচনায় আসে।
হঠাৎ করেই শহর বন্দর এলাকায় কয়েকজন যুবক দলীয় পতাকা ও ব্যানার নিয়ে মিছিল করছেন। ব্যানারে শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা, শেখ মনি এবং আজমেরী ওসমানের ছবি থাকে। সে মিছিলটি নিজেরাই ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেয়। কিন্ত সরাসরি আজমেরী ওসমানের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বা পেজ থেকে প্রচার হয় না।
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, জেলা যুবলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার লক্ষ্যেই আজমেরী ওসমানের অনুসারীরা এসব কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।
একই সময়ে আলোচনায় রয়েছেন জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাফায়েত আলম সানি। সম্প্রতি বন্দর ও ৩০০ ফিট সহ বিভিন্ন এলাকায় তার অনুসারীদের ব্যানারসহ মিছিল করতে দেখা গেছে। বিভিন্ন ব্যানারে যুবলীগের বর্তমান ও সাবেক নেতাদের ছবি ব্যবহার করা হয়।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের মতে, যুবলীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে ঘিরে একটি নীরব প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। একদিকে আজমেরী ওসমানের অনুসারীরা মাঠে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে সাফায়েত আলম সানির সমর্থকরাও নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের অনেক শীর্ষ নেতা এলাকা ছেড়ে চলে যান। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতা বর্তমানে পরিবারসহ দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবেক এমপি ও বিভিন্ন নেতার ভিডিও, বক্তব্য এবং পোস্ট নতুন করে ভাইরাল হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে আবারও রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার প্রস্তুতির গুঞ্জন ছড়িয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, অতীতেও আজমেরী ওসমানের অনুসারীদের বিভিন্ন কর্মসূচি ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। বিশেষ করে ২০১৩ সালে মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের পর তার বাবার বিরুদ্ধে শহরের বিভিন্ন স্থানে ঝাড়ু মিছিল নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক ঝটিকা মিছিলগুলোও সেই পুরোনো রাজনৈতিক উত্তেজনার স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
নগরবাসীর একাংশ মনে করছেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের নামে ধারাবাহিকভাবে মিছিল হওয়ার ঘটনা প্রশাসনের জন্যও একটি চ্যালেঞ্জ। যদিও এসব ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবুও পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনের পর্যবেক্ষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জে সাম্প্রতিক ঝটিকা মিছিলগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এগুলো ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান ও নেতৃত্বের বার্তা বহন করছে কি না, সেটিই এখন আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।

