ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও নৃশংস ঘটনাগুলোর একটি ‘সাত খুন’। আজ সেই বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের একযুগ পূর্ণ হলো। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঘটে যাওয়া এই নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু নারায়ণগঞ্জ নয়, সারাদেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততা, অপহরণ, হত্যা এবং লাশ গুমের চেষ্টা—সব মিলিয়ে ঘটনাটি দেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
যেভাবেঘটেসাতখুনেরঘটনা
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার কয়েকজন সহযোগী এবং আইনজীবী চন্দন সরকারসহ মোট সাতজনকে অপহরণ করা হয়।
নিহতরা হলেন- নজরুল ইসলাম, তাজুল ইসলাম, লিটন সরকার, জাহাঙ্গীর আলম, নজরুলের গাড়িচালক সেলিম মিয়া, অ্যাডভোকেট চন্দন সরকার, ইব্রাহিম কাশেম। অপহরণের তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদী থেকে একে একে সাতজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। লাশগুলোর শরীরে ইট বেঁধে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, যাতে প্রমাণ গোপন করা যায়।
সারাদেশে তোলপাড়
ঘটনার পরপরই নারায়ণগঞ্জসহ সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন এবং সুশীল সমাজ দ্রুত বিচার দাবি করে রাজপথে নামে। সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল—র্যাবের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে অপহরণ ও হত্যার অভিযোগ ওঠা। পরে তদন্তে সেই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।
যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
মামলার তদন্তে উঠে আসে, তৎকালীন র্যাব-১১ এর কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর (অব.) আরিফ হোসেন এবং নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা এমএম রানাসহ কয়েকজন পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। অভিযোগ ছিল, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
আদালতের রায়
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে হাইকোর্ট অধিকাংশ মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। পরে আপিল বিভাগেও সেই রায় বহাল থাকে।
একযুগ পরও স্বজনদের আহাজারি
আজও নিহতদের পরিবারের সদস্যরা সেই দিনের বিভীষিকা ভুলতে পারেননি। স্বজন হারানোর বেদনা তাদের প্রতিদিন তাড়িয়ে বেড়ায়। তারা বলছেন, বিচার হলেও প্রিয়জন তো আর ফিরে আসবে না। নজরুল ইসলামের পরিবার বলছে, “একযুগ কেটে গেছে, কিন্তু এখনো মনে হয় এই তো সেদিনের ঘটনা।”
নারায়ণগঞ্জবাসীর স্মৃতিতে রক্তাক্ত অধ্যায়
নারায়ণগঞ্জের মানুষ এখনো সাত খুনের ঘটনাকে শহরের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে মনে করে। এ ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, সাত খুনের ঘটনা প্রমাণ করেছে—ক্ষমতার অপব্যবহার কত ভয়াবহ হতে পারে। একই সঙ্গে এই মামলার বিচার দেখিয়েছে, জনচাপ ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বড় অপরাধেরও বিচার সম্ভব।
আজ একযুগ পর নারায়ণগঞ্জবাসী নিহত সাতজনকে স্মরণ করছে গভীর শ্রদ্ধায়। একই সঙ্গে এমন নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন আর কখনো না ঘটে সেই প্রত্যাশাই সবার।

