ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে নারায়ণগঞ্জে পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধে অচল হয়ে পড়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়ক। প্রায় চার ঘণ্টা ধরে চলা এ অবরোধে সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে কর্মজীবী মানুষসহ বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বিকেল পাঁচটার দিকে শ্রমিকরা সড়ক ছেড়ে দিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
সোমবার (২ নভেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফতুল্লার কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে বেলা ১২টার দিকে তাঁরা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শ্রমিকদের অবরোধের কারণে সড়কের উভয় পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। বেলা আড়াইটার দিকে ভূঁইগড় এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। এ সময় হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। প্রায় আধা ঘণ্টা পর বৃষ্টি থামলে কিছু সময়ের জন্য যান চলাচল শুরু হয়। তবে পরবর্তী সময়ে শিবু মার্কেট এলাকায় শ্রমিকরা পুনরায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করলে আবারও যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের অভিযোগ, বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে তাঁদের বেতনের কোনো সামঞ্জস্য নেই। স্বল্প বেতনে বাসাভাড়া, খাবার, চিকিৎসা ও পরিবারের অন্যান্য খরচ মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
মেট্রো নিটিং অ্যান্ড ডাইং কারখানার শ্রমিক শহিদুল ইসলাম জানান, তাঁর মাসিক বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা। এর মধ্যে বাসাভাড়া বাবদ দিতে হয় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। এক মাসের বাজার করতেই খরচ হয় প্রায় ১০ হাজার টাকা। চিকিৎসার একটি পরীক্ষার জন্যও পাঁচ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়। এ অবস্থায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর দাবি, শ্রমিকদের বাঁচার স্বার্থে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করতে হবে।
হাবিবুর রহমান নামে আরেক শ্রমিক বলেন, চার সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী তিনি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বর্তমান বেতনে পরিবারের ভরণপোষণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘আমরা কাজ করেই বাঁচতে চাই। কাজ ছাড়া তো টাকা চাই না। বাঁচার মতো বেতন দিতে হবে। বাসাভাড়া, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে এই বেতনে সংসার চালানো অসম্ভব। সরকার যদি দ্রব্যমূল্য ও অন্যান্য খরচ কমাতে না পারে, তাহলে আমাদের বেতন ৩০ হাজার টাকা করতে হবে।’
এদিকে নারায়ণগঞ্জের পাশাপাশি ঢাকা ও গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনে হতাহতের ঘটনার প্রতিবাদও জানান বিক্ষোভকারীরা।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি পুলিশের সাঁজোয়া যান ও জলকামানের গাড়ি প্রস্তুত রাখা হয়। জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) জানান, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে কয়েকটি কারখানার কয়েকশ শ্রমিক সড়কে নেমে অবরোধ করেছেন। এতে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
অবরোধের কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন দূরপাল্লার যাত্রী ও সাধারণ পথচারীরা। অনেককে কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়। কেউ কেউ বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করেন।
সিলেট থেকে আসা হাজেরা বেগম সাইনবোর্ড এলাকায় বাস থেকে নেমে চাষাঢ়ার উদ্দেশে রওনা দেন। কিছুটা পথ ব্যাটারিচালিত রিকশায় যাওয়ার পর যানজটের কারণে তাঁকে নেমে হাঁটতে হয়। তাঁর গন্তব্য আরও প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে। দুই ব্যাগ নিয়ে এতটা পথ কীভাবে যাবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান তিনি।
অন্যদিকে, গরুবোঝাই পিকআপ নিয়ে ফতুল্লা স্টেডিয়াম এলাকায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকেন চালক আব্দুর রহমান। তিনি জানান, কাঞ্চন ব্রিজ থেকে গোগনগরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু যানজটে পড়ে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে একই স্থানে আটকে রয়েছেন।
বিকেল সাড়ে চারটার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা শ্রমিকদের সড়কের এক পাশে সরিয়ে দিলে যান চলাচল সীমিত পরিসরে শুরু হয়। এ সময়ও শ্রমিকরা তাঁদের দাবিতে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন।
পরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে জেলা পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান শ্রমিকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘কেউ উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করবেন না। সরকার আপনাদের নিয়ে কাজ করছে। আপনাদের বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত আসবে।’
এ সময় শ্রমিকরা আবারও তাঁদের দাবির পক্ষে স্লোগান দেন এবং ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দাবি জানান।
ঘটনাস্থলে নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম আজাদ, জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির এবং মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
অবশেষে বিকেল পাঁচটার দিকে শ্রমিকরা সড়ক থেকে সরে গেলে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কে যান চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়। তবে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি ও পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

