নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন নতুন করে শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক, বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং কর্মসংস্থানের নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। বকেয়া বেতন, মজুরি বৃদ্ধি, কারখানা চালু রাখা এবং চাকরি হারানোর আশঙ্কাসহ বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সোমবার (২ নভেম্বর) জেলার বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চলে অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, সাইনবোর্ড, কাঁচপুর ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে পোশাক কারখানাকেন্দ্রিক শ্রমিক অসন্তোষের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। শ্রমিকদের দাবি, সময়মতো বেতন পরিশোধ না হওয়া এবং কর্মস্থলে অনিশ্চয়তার কারণে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ফতুল্লার কুতুবাইল-কাঠেরপুল এলাকার কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে রাস্তায় নেমে আসেন। পরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তারা শিবু মার্কেট এলাকায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধ করেন। একপর্যায়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে জালকুড়ি, ভূঁইগড় ও সাইনবোর্ডমুখী এলাকায়।
মেট্রো নিটিং, পালমাল গার্মেন্টস, আবির ফ্যাশন, আজাদ-রিফাত ডাইং, লিবার্টি ও মিডল্যান্ডসহ বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা এতে অংশ নেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আশপাশের প্রায় ২০টি ছোট-বড় কারখানার শ্রমিকরা আন্দোলনে যুক্ত হন।
শ্রমিকদের একাংশ সড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। কোথাও কোথাও সড়কে আগুন জ্বালিয়ে এবং প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে যানবাহন চলাচলে বাধা দেওয়া হয়। ভূঁইগড় এলাকায় একটি কারখানার জানালার কাচ ভাঙার ঘটনাও ঘটেছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে অবস্থান নেয়।
আন্দোলনকারীদের দাবিগুলো শুধু বেতন বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের উত্থাপিত পাঁচটি প্রধান দাবি হলো-পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। সব পোশাক কারখানায় রেশনিং ব্যবস্থা চালু। শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার নিশ্চিত করা। শ্রমিক আমজাদ হোসেন কামালসহ আন্দোলনে নিহত শ্রমিকদের হত্যাকাণ্ড তদন্তে বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন। বেআইনি ও ইচ্ছামতো শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ এবং সর্বস্তরে শ্রম আইন বাস্তবায়ন।
শ্রমিকদের আন্দোলনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। বর্তমানে পোশাক খাতের প্রচলিত ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ বাড়িভাড়া, খাবার, চিকিৎসা, যাতায়াত ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটাতে এই আয়ের ওপর নির্ভরশীল শ্রমিকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
মেট্রো নিটিং অ্যান্ড ডাইংয়ের শ্রমিক শহিদুল ইসলাম বলেন, তার মাসিক বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা। এর মধ্যে বাড়িভাড়া ৫ হাজার ৫০০ টাকা। বাজার খরচেই প্রয়োজন হয় আরও প্রায় ১০ হাজার টাকা। চিকিৎসা পরীক্ষার জন্য আলাদা খরচ রয়েছে। শ্রমিকদের বক্তব্য, বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বাড়ানো না হলে পরিবার নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে পড়বে।
শ্রমিকদের অবরোধে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। শিবু মার্কেট, জালকুড়ি, ভূঁইগড় ও সাইনবোর্ড এলাকায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। অনেক যাত্রী বাস থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যে রওনা দেন। কেউ বিকল্প পথ ব্যবহার করেন, আবার অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহনে আটকে থাকেন।
বিকেল ৫টার দিকে আন্দোলনকারীরা সড়ক ছেড়ে চলে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। তবে এর আগে কয়েক দফায় সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভের কারণে যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হয়।
অবরোধের খবর পেয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ ও শিল্প পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) তারেক আল মেহেদী শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। বিকেল আড়াইটার দিকে ভূঁইগড় এলাকায় পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও আন্দোলনকারীদের মুখোমুখি অবস্থানের পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে বৃষ্টি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রচেষ্টায় সড়ক থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়।
জেলা পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শ্রমিকদের বিষয়গুলো নিয়ে সরকার কাজ করছে এবং তাদের দাবির বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে। ঘটনাস্থলে নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম আজাদ ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রায়হান কবিরও উপস্থিত ছিলেন ।
নারায়ণগঞ্জ দেশের অন্যতম প্রধান পোশাক ও নিটওয়্যার শিল্পাঞ্চল। এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। ফলে শ্রমিকদের অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হলে শুধু কারখানার উৎপাদন নয়, পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও রপ্তানি কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি, অন্যদিকে কারখানার উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। মালিকপক্ষ, শ্রমিক সংগঠন ও সরকারের মধ্যে কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে শ্রমিকদের পাঁচ দফা দাবি পর্যালোচনা, মজুরি বোর্ডের দ্রুত কার্যক্রম, শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ এবং শ্রম আইন বাস্তবায়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না এলে শিল্পাঞ্চলে অসন্তোষ আবারও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে ২ নভেম্বরের নারায়ণগঞ্জের শ্রমিক আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে শুধু কারখানা চালু রাখলেই শিল্পের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয় না, শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।

