নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে ঘিরে নগর রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একসময় হকার উচ্ছেদে সংসদ সদস্য, প্রশাসন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও পেশাজীবী মহলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে মাঠে নামলেও সময়ের ব্যবধানে সেই ঐক্য কতটা অটুট রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে, জেলা আইনজীবী সমিতিতে সংঘর্ষ ও তাঁকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্ক তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলেছে। সর্বশেষ হকার উচ্ছেদ অভিযানেও তাঁকে বিক্ষোভ ও বাধার মুখে পড়তে হয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে, নগরীর ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ থেকে শুরু করে আইনজীবী সমিতির অভ্যন্তরীণ বিরোধ সব মিলিয়ে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন সাখাওয়াত। এর সঙ্গে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন ও সাংগঠনিক সম্পর্কের প্রশ্ন যুক্ত হওয়ায় তাঁর নেতৃত্ব নিয়েও নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।
চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের ব্যস্ততম বঙ্গবন্ধু সড়কসহ বিবি রোডে হকার, অবৈধ দখলদার ও অননুমোদিত পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর আগে ৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সভায় নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম, নাসিক প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান, জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও র্যাবসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়।
অভিযানকে ঘিরে শুরুতে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের চিত্র দেখা যায়। নগরীর ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের উপযোগী করা, যানজট কমানো এবং অবৈধ দখল বন্ধ করার বিষয়টি সামনে রেখে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট বিরোধ সেই উদ্যোগের বাস্তবায়ন ও স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
১৩ এপ্রিলের অভিযানের পরও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় হকারদের উপস্থিতি এবং ফুটপাত দখল নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকে। হকারদের পুনর্বাসন, বিকল্প কর্মসংস্থান কিংবা নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবসার সুযোগ নিশ্চিত করার প্রশ্নও আলোচনায় আসে। ফলে শুধু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।
সর্বশেষ ২৬ অক্টোবর পুরাতন কোর্ট এলাকার সামনে হকার উচ্ছেদ করতে গিয়ে বিক্ষোভের মুখে পড়েন সাখাওয়াত হোসেন খান।
এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট, হকার উচ্ছেদের প্রশ্নে প্রশাসনের সঙ্গে হকারদের বিরোধ এখনো কাটেনি। একই সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগের পর রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যায়ে সেই উদ্যোগের পক্ষে কতটা কার্যকর সমর্থন রয়েছে, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
হকার উচ্ছেদে শুরুতে যাঁরা বিভিন্ন পর্যায়ে সমর্থন দিয়েছিলেন, পরবর্তী সময়ে তাঁদের সক্রিয় ভূমিকা কতটা অব্যাহত রয়েছে এ প্রশ্ন এখন সামনে আসছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বলছে, হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে সাখাওয়াতকে একাধিকবার বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। একদিকে নগরীর ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার প্রশাসনিক দায়িত্ব, অন্যদিকে জীবিকা হারানোর আশঙ্কায় হকারদের ক্ষোভ এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় করা তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
হকার উচ্ছেদ নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই গত ৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি, হট্টগোল ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও নাসিক প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এইচ এম আনোয়ার প্রধানের অনুসারীরা মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসেন।
আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ুন কবিরের কক্ষে আইনজীবীদের খাওয়াদাওয়ার আয়োজনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয় একপর্যায়ে পরিস্থিতি হাতাহাতিতে গড়ায়। এ ঘটনায় আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকিরসহ কয়েকজন আইনজীবী আহত হন । সাখাওয়াত হোসেন খানকেও হেনস্তার মুখে পড়তে হয় এবং তাঁকে প্রায় দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ রাখা হয়েছিল বলে দাবী করা হয়।
একই রাজনৈতিক বলয়ের আইনজীবীদের মধ্যে এমন বিরোধ দলীয় ঐক্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে সাখাওয়াতের সাংগঠনিক নেতৃত্ব এবং আইনজীবী অঙ্গনে তাঁর অবস্থান দুই ক্ষেত্রেই ঘটনাটি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সাখাওয়াতের ক্ষেত্রে এই বিরোধের তাৎপর্য আরও বেশি। কারণ, তিনি শুধু একজন আইনজীবী নন; তিনি মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এবং সিটি করপোরেশনের প্রশাসকও। ফলে আইনজীবী সমিতির বিরোধ তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রশাসনিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের শক্তি শুধু পদ-পদবিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং দুঃসময়ে পাশে থাকার মধ্য দিয়েও সেই শক্তি তৈরি হয়। নারায়ণগঞ্জের বিএনপির রাজনীতিতে সাখাওয়াত হোসেন খানের অবস্থান নিয়ে আলোচনায় এখন এই বিষয়গুলোও সামনে আসছে।
দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করা কিংবা সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের যথাযথ অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করার অভিযোগ সত্য হলে তা দীর্ঘমেয়াদে নেতৃত্বের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো থেকে একটি প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখতে সাখাওয়াত কতটা সফল হচ্ছেন? হকার উচ্ছেদে রাজনৈতিক সমন্বয় বজায় রাখা, আইনজীবী সমিতির বিরোধ নিরসন এবং তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার ক্ষেত্রে তাঁর সামনে এখন একাধিক পরীক্ষা রয়েছে।
হকার উচ্ছেদে শুরুতে দৃশ্যমান সমন্বিত উদ্যোগ, পরবর্তী সময়ে হকারদের বিক্ষোভ এবং আইনজীবী সমিতিতে নিজ দলের সমর্থক আইনজীবীদের দুই পক্ষের বিরোধ এই তিনটি ঘটনাকে পাশাপাশি রাখলে সাখাওয়াত হোসেন খানের সামনে তৈরি হওয়া চ্যালেঞ্জগুলো স্পষ্ট হয়।
বলা যায়, তাঁর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। নগরীর ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার উদ্যোগকে স্থায়ী রূপ দিতে হলে হকারদের সঙ্গে সমাধানমুখী আলোচনা, সংশ্লিষ্ট সংস্থার ধারাবাহিক সহযোগিতা এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিরসন ও তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোও জরুরি।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে সাখাওয়াত হোসেন খান এখন এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতা কিংবা দলীয় পদ দিয়ে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন। তাঁর সামনে বড় প্রশ্ন বিরোধের মধ্যেও তিনি কি রাজনৈতিক সমন্বয় ফিরিয়ে আনতে পারবেন, নাকি একের পর এক ঘটনায় তাঁর নেতৃত্ব আরও চাপের মুখে পড়বে?

