নারায়ণগঞ্জ মহানগর যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কে এম মাজহারুল ইসলাম জোসেফ ও অ্যাডভোকেট রাকিবুর রহমান সাগর। যুবদলের বর্তমান কমিটিতে তাঁদের সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পরও দুজনের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি আয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম সজল ও সদস্যসচিব শাহেদ আহমেদ।
তবে এই বিতর্ক শুধু প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচয়, সাংগঠনিক পদ-পদবি, মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয়তা এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের স্বীকৃতি সব মিলিয়ে জোসেফ ও সাগরকে ঘিরে মহানগর যুবদলের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের প্রশ্নটি সামনে এসেছে। তাঁদের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের অবস্থান এবং বর্তমান কমিটির সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা চলছে।
আলোচনার বিশেষ কেন্দ্রে রয়েছেন কে এম মাজহারুল ইসলাম জোসেফ। ২০২৬ সালের ১১ জুন যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির এক বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করা হয়, মনিরুল ইসলাম সজল ও শাহেদ আহমেদের নেতৃত্বাধীন নারায়ণগঞ্জ মহানগর যুবদলের ৫১ সদস্যের কমিটিতে জোসেফের নাম নেই। সংগঠনটির নাম বা পদবি ব্যবহার করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করার বিষয়েও বিজ্ঞপ্তিতে সতর্ক করা হয়।
কেন্দ্রীয় কমিটির এমন অবস্থানের পরও জোসেফের নেতৃত্বে যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি আয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ২৮ অক্টোবর নগরীর মণ্ডলপাড়া পুল এলাকা থেকে তাঁর নেতৃত্বে র্যালি বের হয়। পরে প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ওই কর্মসূচিতে মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু সহ মহানগর যুবদলের আওতাধীন বিভিন্ন থানা ও ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ করে। এখানেই আলোচনার মূল বিষয় কেন্দ্রীয় কমিটির ঘোষিত সাংগঠনিক অবস্থানের বাইরে থেকে কীভাবে একজন নেতা যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন? আবার তাঁর কর্মসূচিতে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণও রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর অবস্থান নিয়ে কৌতূহল বাড়িয়েছে।
তবে কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি বা সমর্থনকে কেন্দ্রীয় কমিটির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে, কমিটিতে নাম না থাকা মানেই তাঁর অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন শেষ হয়ে যায় না।
অন্যদিকে, অ্যাডভোকেট রাকিবুর রহমান সাগরকে ঘিরে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে সিদ্ধিরগঞ্জে যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান থেকে। ২৭ অক্টোবর সিদ্ধিরগঞ্জের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের নয়াপাড়া নাভানা মাঠে তাঁর নেতৃত্বে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। কর্মসূচিতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, পায়রা ওড়ানো, মাছের পোনা অবমুক্তকরণ, মশক নিধন এবং কেক কাটার আয়োজন ছিল।
তবে কেক কাটাকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সমালোচনা শুরু হয়। মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম সজল জানিয়েছেন, সাগরের বর্তমান কমিটিতে সদস্যপদ নেই। ফলে তাঁর নেতৃত্বে যুবদলের নামে কর্মসূচি আয়োজনের সাংগঠনিক ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সাগরের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি হিসেবে। কিন্তু ছাত্রদলের সাবেক নেতৃত্বের পরিচয় এবং যুবদলের বর্তমান কমিটির পদ-পদবি এক বিষয় নয়। ফলে তাঁর রাজনৈতিক অতীতের পাশাপাশি বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থানও আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম সজল ও সদস্যসচিব শাহেদ আহমেদের আপত্তির মূল বিষয় হলো, সংগঠনের অনুমোদিত কমিটিতে পদ না থাকা ব্যক্তিরা যুবদলের পরিচয়ে কর্মসূচি পালন করলে সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংগঠনের নাম ব্যবহার করে কর্মসূচি আয়োজনের ক্ষেত্রে সাংগঠনিক পরিচয় স্পষ্ট থাকা জরুরি।
অন্যদিকে, জোসেফের নেতৃত্বে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের অবস্থানও আলোচনায় এসেছে। ২৮ অক্টোবরের সমাবেশে বক্তব্য দেওয়া নেতারা অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী কর্মীদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। অর্থাৎ, বিতর্কটি শুধু কমিটিতে কার নাম আছে বা নেই সেখানেই থেমে নেই, বরং রাজনৈতিক অবদান, সাংগঠনিক স্বীকৃতি ও নেতৃত্বের কর্তৃত্ব নিয়েও মতপার্থক্য সামনে এসেছে।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর যুবদলের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমত, কেন্দ্রীয় কমিটির ঘোষিত তালিকা ও মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক তৎপরতার মধ্যে দৃশ্যমান ব্যবধান রয়েছে। দ্বিতীয়ত, সাবেক ছাত্রদল নেতাদের রাজনৈতিক পরিচয় তাঁদের যুবদলের বর্তমান পদ-পদবির প্রশ্ন থেকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মতো সাংগঠনিক অনুষ্ঠানে একাধিক পক্ষের কর্মসূচি আয়োজন সংগঠনের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে, যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে জোসেফ ও সাগরকে নিয়ে তৈরি হওয়া আলোচনা নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের স্বীকৃতির প্রশ্ন সামনে এনেছে। এখন দেখার বিষয়, কেন্দ্রীয় যুবদল ও মহানগর নেতৃত্ব এই বিতর্ক নিরসনে কী পদক্ষেপ নেয় এবং সংগঠনের পরিচয় ব্যবহারের বিষয়ে কতটা স্পষ্ট অবস্থান জানায়।

