নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে একসময় শামীম ওসমান ছিলেন অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক চরিত্র। তার একটি নির্দেশকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর রাজপথে উপস্থিতি ছিল জেলার রাজনীতির পরিচিত দৃশ্য। সভা-সমাবেশ, মিছিল কিংবা দলীয় কর্মসূচিতে তার অনুসারীদের সরব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই চিত্রে এসেছে বড় পরিবর্তন। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান বর্তমানে পলাতক একাধিক মামলার আসামী হয়ে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। আর তার অনুপস্থিতিতে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বলয়ের তৃণমূল নেতাকর্মীদের একটি অংশ কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার র্শতে তারা অভিযোগ করে বলেন, রাজনৈতিক সুসময়ে শামীম ওসমানের সঙ্গে রাজপথে সক্রিয় থাকা নেতাকর্মীদের অনেকেই এখন মামলা, আত্মগোপন, আর্থিক সংকট ও সামাজিক চাপের মধ্যে রয়েছেন। কিন্তু তাদের অনেকের সঙ্গেই শামীম ওসমানের সরাসরি যোগাযোগ নেই। র্শীষ নেতাদের কোন নাম্বার এমনকি তারা এক সেকেন্ডের জন্য কথা বলতে চায় না।
শামীম ওসমানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন তৃণমূল নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর তাদের অনেকেই এলাকায় স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছেন না। কেউ আত্মগোপনে রয়েছেন, কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিরাপদ স্থানে অবস্থান করছেন।কেউ বা বাড়িতে থাকতে পারছেন না, গ্রেফতার আতংকে বাড়ি ঘর ছাড়া হয়ে আছেন।
১২নং ওর্য়াডের যুবলীগের একজন তৃণমূল কর্মী বলেন, “রাজনৈতিক কর্মসূচি এলে আমাদের সবার আগে ডাকা হতো। নেতার নির্দেশে আমরা রাস্তায় থেকেছি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার পর অনেকেই বিপদে পড়েছি। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার মতো আর্থিক সামর্থ্য অনেকের নেই।”
১৩নং ওর্য়াড আওয়ামীলীগের আরেকজন বলেন, “আমাদের অনেকের পরিবার আছে। কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গেছে। মামলা ও গ্রেপ্তারের আতঙ্কে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় অন্তত নেতার কাছ থেকে খোঁজ নেওয়া বা কোনো ধরনের সহযোগিতা আশা করেছিলাম।”
তাদের দাবি, তৃণমূলের অনেক কর্মী এখন নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও সংকটে পড়েছেন। দীর্ঘদিন যে পরিচয় তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছিল, সেটিই এখন অনেকের জন্য চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কিছু নেতা এখনো তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছেন। তাদের কেউ কেউ আত্মগোপনে থেকে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করছেন। তবে সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে সেই যোগাযোগের পরিধি কতটা বিস্তৃত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তৃণমূলের কয়েকজন নেতাকর্মীর অভিযোগ, শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ যাদের রয়েছে তারা নিজেদের বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও সাধারণ কর্মীদের বড় অংশ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
এক কর্মীর ভাষায়, “নেতার খুব কাছের কয়েকজন হয়তো যোগাযোগ করতে পারছেন। কিন্তু ইউনিয়ন, ওয়ার্ড কিংবা মহল্লা পর্যায়ের সাধারণ কর্মীদের খবর কে রাখছে এটাই এখন বড় প্রশ্ন।”
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে শামীম ওসমানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বলয় গড়ে উঠেছিল। তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অনেক নেতাকর্মীর রাজনৈতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। ফলে তার অনুপস্থিতিতে সেই বলয়ের সাংগঠনিক সক্ষমতা কতটা কার্যকর থাকবে, সেটিও এখন আলোচনায়।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কোনো রাজনৈতিক সংগঠন যদি দীর্ঘ সময় একজন কেন্দ্রীয় নেতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, ওই নেতার অনুপস্থিতিতে তৃণমূলের সঙ্গে নেতৃত্বের যোগাযোগ দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বর্তমানে শামীম ওসমানের অনুসারীদের মধ্যে এমন পরিস্থিতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।
তবে শামীম ওসমানের অনুসারীদের সবাই যে রাজনীতি থেকে সরে গেছেন, এমনটিও বলা যাচ্ছে না। তাদের একটি অংশ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং রাজনৈতিক পরিবেশ পরিবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
শামীম ওসমানের অনুপস্থিতিতে তার অনুসারীদের সামনে এখন কয়েকটি বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। প্রথমত, তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে নেতৃত্বের যোগাযোগ কীভাবে পুনঃস্থাপিত হবে। দ্বিতীয়ত, মামলা ও অন্যান্য চাপের মধ্যে থাকা নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে কে সমন্বয় করবে। তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে শামীম ওসমানের পুরোনো বলয় আগের কাঠামোতে ফিরতে পারবে কি না।
এর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এই বলয়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কারণ শুধু ব্যক্তিগত নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে কোনো রাজনৈতিক বলয় দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে কি না সেটিও এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
দীর্ঘদিন মাঠে থাকা নেতাকর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে, তা হলো দুঃসময়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের অভাব।
একাধিক তৃণমূল নেতাকর্মী বলেন, “রাজনীতিতে সুসময়–দুঃসময় দুটোই থাকে। সুসময়ে হাজার হাজার কর্মী পাশে থাকে, কিন্তু দুঃসময়ে যদি কর্মীদের খোঁজ না নেওয়া হয়, তাহলে কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক।”
সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে শামীম ওসমানের দীর্ঘ অনুপস্থিতি তার পুরোনো রাজনৈতিক বলয়ের জন্য একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। একসময় যে বলয় ছিল রাজপথের অন্যতম দৃশ্যমান শক্তি, এখন সেই বলয়ের তৃণমূল কর্মীদের একটি অংশ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়েই অনিশ্চয়তায় রয়েছেন বলে দাবি করছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে এগোয় এবং শামীম ওসমানের নেতৃত্বাধীন পুরোনো বলয় ভবিষ্যতে কীভাবে নিজেদের সংগঠিত করে তার ওপরই অনেকটাই নির্ভর করবে এই বলয়ের পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান।

