ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ পবিত্র হজ পালনে হাজিদের নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও স্বস্তিদায়ক সেবা নিশ্চিত করতে সরকারি হজ গাইডদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছে বাংলাদেশ হজ মিশন ও ধর্ম মন্ত্রণালয়। সভায় মিনার তাবু ব্যবস্থাপনা, খাবার সরবরাহ, আরাফার মাঠে তীব্র গরমে গাইডদের দুর্ভোগ, পরিবহন সংকট এবং হাজীদের বসার ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সোমবার (১৮ মে) সকালে সৌদি আরবের মক্কা নগরীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত এ সভায় ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তা, বাংলাদেশ হজ মিশনের সদস্য এবং সরকারি হজ গাইডরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন হজ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. আয়াতুল ইসলাম।
সভায় গাইডরা জানান, অতীত অভিজ্ঞতায় মিনার তাবুতে বসার ক্ষেত্রে প্রায়ই বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। অনেক হাজী প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জায়গা দখল করে ফেলায় পরে আসা হাজীরা বসার সুযোগ পান না। এছাড়া অনেক সময় গাইডদের নির্দেশনা না মানার কারণেও সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়।
এ বিষয়ে কর্মকর্তারা জানান, প্রতিটি গাইডকে তার নির্ধারিত হাজীদের নির্দিষ্ট অংশে বসানোর নির্দেশনা আগেই দেওয়া হয়েছে। কোনো হাজী যাতে অতিরিক্ত জায়গা দখল করতে না পারেন সে বিষয়ে গাইডদের আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি তাবুর ভেতরে চলাচলের সুবিধার্থে ‘রোড জিরো’ খালি রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
সভায় মিনায় খাবার বিতরণ ব্যবস্থা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়। গাইডরা অভিযোগ করেন, খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এতে গাইড ও হাজী উভয়কেই চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। অনেক সময় এ নিয়ে অপ্রীতিকর পরিস্থিতিও তৈরি হয়।
জবাবে কর্মকর্তারা জানান, এবার মিনায় একটি ফুড স্টেশনের পরিবর্তে একাধিক ফুড স্টেশন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ভিড় ও অপেক্ষার সময় কমে আসে। পাশাপাশি গাইডভিত্তিক খাবারের প্যাকেট প্রস্তুত করে দ্রুত সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে সরাসরি তাবুর সামনে খাবার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে বলে জানান তারা।
আরাফার মাঠে গাইডদের দুর্ভোগ নিয়েও আলোচনা হয়। কয়েকজন গাইড বলেন, তীব্র রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ বিষয়ে কর্মকর্তারা জানান, এবার সরকারি টিম সদস্যদের গাইডদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যাতে গাইডদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়াতে না হয় এবং দ্রুত তাবুতে খাবার পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।
পরিবহন ব্যবস্থাপনা নিয়েও গাইডরা গুরুত্বপূর্ণ মতামত দেন। বিশেষ করে মিনায় যাওয়া-আসা এবং জামারাতে পাথর নিক্ষেপ শেষে হাজীদের চলাচল সহজ করতে বিকল্প রুট ও শাটল বাস ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কর্মকর্তারা জানান, হাজীদের সুবিধাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সভায় এলাকাভিত্তিক বা জেলাভিত্তিক হাজীদের একই এলাকায় রাখার প্রস্তাবও আসে। গাইডদের মতে, একই এলাকার হাজীরা একসঙ্গে থাকলে ভাষা, সংস্কৃতি ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার কারণে ব্যবস্থাপনা আরও সহজ হয়। এ প্রস্তাব ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করার আশ্বাস দেন কর্মকর্তারা।
সভায় কর্মকর্তারা বলেন, ‘হাজীদের যেন মানসিক ও শারীরিকভাবে কষ্ট পেতে না হয়, সেটাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। অতীতের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত সমাধান বাস্তবায়নের মাধ্যমে এবারের হজ ব্যবস্থাপনাকে আরও উন্নত করা হবে ইনশাআল্লাহ।’
হজ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. আয়াতুল ইসলাম বলেন, হাজীদের পরিমিত খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও মানসিকভাবে আশ্বস্ত রাখার বিষয়ে গাইডদের সচেতন থাকতে হবে। হজের প্রতিটি কার্যক্রম সহজভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে হবে। তিনি গাইডদের শতভাগ নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান। বিশেষ করে বয়স্ক হাজীদের প্রতি বাড়তি যত্ন ও সহযোগিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ধর্মমন্ত্রীর ভাই কাজি জুন্নুন বসরি বলেন, হজ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সমস্যা দেখা দিলে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে এবং হাজীদেরও ধৈর্য ধারণের পরামর্শ দিতে হবে। তিনি বলেন, নিয়ম-কানুন মেনে চলার মাধ্যমেই সুন্দরভাবে হজ কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব। আল্লাহর মেহমানদের সেবায় যেন কোনো ত্রুটি না থাকে সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি অধিকাংশ হাজী বয়স্ক হওয়ায় তাদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ হজ মিশনের কাউন্সিলর মো. কামরুল ইসলাম বলেন, হজ পালনের সময় ধৈর্য, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মানসিকতা অত্যন্ত জরুরি। নিজের চেয়ে অন্যের সেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। তিনি গাইডদের হাজিদের প্রতি সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।
মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোহাম্মদ মাহবুব আলম বলেন, গাইডদের মূল দায়িত্ব হলো হাজিদের ইবাদতের প্রতি মনোযোগী রাখা এবং তাদের শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করা। তিনি গরমে অপ্রয়োজনীয় চলাফেরা না করার পরামর্শ দেন এবং দুর্বল ও বয়স্ক হাজীদের প্রতি বাড়তি যত্ন নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি হালকা ও পরিমিত খাবার গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, হাজিদের সেবায় গাইডদের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া ‘লাব্বাইক’ ও ‘নুসুক’ অ্যাপ ব্যবহারে হাজিদের উৎসাহিত করার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

