রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নারায়ণগঞ্জে বিএনপির রাজনীতিতে যেমন নতুন নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক তৎপরতা বেড়েছে, তেমনি দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখল, ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, সংঘর্ষ ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনায় কোথাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করেছে, কোথাও দলীয়ভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। ফলে ক্ষমতায় আসার পর নারায়ণগঞ্জ বিএনপির জন্য নিজেদের নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ এখন গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহে দেখা যায়, অভিযোগের ধরন শুধু স্থানীয় পর্যায়ের ছোটখাটো ব্যবসা বা দোকানপাটে সীমাবদ্ধ নেই; পরিবহন খাত, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনাকে ঘিরেও অভিযোগ এসেছে।
চাঁদাবাজির অভিযোগে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে গত জুনে। নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে এবং জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীবকে একাধিক চাঁদাবাজির অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জিজ্ঞাসাবাদ করে।
পুলিশ জানিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরে তাকে ডিবিতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অভিযোগ ছিল, কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ দাবি করা হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ঘটনাটি নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে। কারণ অভিযোগটি এসেছিল ক্ষমতাসীন দলের একজন সংসদ সদস্যের ছেলেকে ঘিরে এবং একই সঙ্গে তিনি যুবদলের গুরুত্বপূর্ণ পদেও ছিলেন।
এর আগে এপ্রিল মাসে সিদ্ধিরগঞ্জে সরকারি জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানপাট ও সড়কে বসানো ভ্যান থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগে নাসিক ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে একাধিক চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিল এবং একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এই ঘটনা স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির ভাবমূর্তি ও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করে।
নারায়ণগঞ্জের পরিবহন খাতেও বিএনপির বিভিন্ন পক্ষের নেতা-কর্মীদের ঘিরে অভিযোগ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গত জুলাইয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের বন্ধন ও উৎসব পরিবহনের বাসে চাঁদাবাজি ও শ্রমিকদের মারধরের অভিযোগে প্রায় আড়াই ঘণ্টা বাস চলাচল বন্ধ ছিল। পরিবহন সংশ্লিষ্ট একজন পরিচালক অভিযোগ করেন, একটি বাস আটকে রেখে সেটি ছাড়ার জন্য ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট বিএনপি নেতার বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। পরে পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপে বাস চলাচল স্বাভাবিক হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনাও। সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হন এবং সেনাবাহিনী ঘটনাস্থল থেকে সাতজনকে আটক করা হয়। অর্থাৎ পরিবহন খাতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি এখন শুধু ব্যবসায়িক বিরোধ হিসেবে নয়, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে আলোচনায় এসেছে।
অভিযোগ থেমে নেই দলীয় সাংগঠনিক পর্যায়েও। গত ৬ সেপ্টেম্বর সোনারগাঁয়ের জামপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. শুক্কুর আলীকে চাঁদাবাজি, সরকারি সম্পত্তির অবৈধ ব্যবহার এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে উগ্র আচরণের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তার কোনো অপকর্মের দায় বিএনপি নেবে না এবং নেতা-কর্মীদের তার সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এরপর ২২ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ মহানগর কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন মোহাম্মদ ফয়সালকে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তারের পর সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে । নারায়ণগঞ্জে চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, সংঘর্ষ, অনিয়ম ও দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে একাধিক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
চাঁদাবাজি ও দখল নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর বিএনপির পক্ষ থেকেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহিষ্কার কিংবা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি অভিযোগ যে দলের পক্ষ থেকে উপেক্ষা করা হয়েছে, এমন চিত্রও নেই।
তবে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসায় প্রশ্ন উঠছে বহিষ্কার ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও কেন একই ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসছে?এখানেই মূল প্রশ্নটি গিয়ে ঠেকে দলের স্থানীয় নেতৃত্ব ও তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণের জায়গায়।
নারায়ণগঞ্জ বিএনপির তৃণমূলের একটি অংশের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় যারা মামলা, হামলা ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে থেকে দলীয় কর্মসূচিতে ছিলেন, তাদের অনেকেই এখন সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছেন না। অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিবেশ পরিবর্তনের পর নতুন করে সক্রিয় হওয়া কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠায় ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।
তবে এই বক্তব্যকে সার্বিক বিএনপি নেতা-কর্মীদের অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দলের একটি অংশের অভিযোগ ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ।
নারায়ণগঞ্জে ব্যবসা, পরিবহন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে পরিবহন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক খাত নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ এসেছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতির পার্থক্য হলো এখন বিএনপি সরকার পরিচালনা করছে। ফলে দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ শুধু স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের বিষয় হিসেবে থাকছে না; সরকারের ভাবমূর্তি ও দলীয় শৃঙ্খলার সঙ্গেও তা যুক্ত হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ বিএনপির জেলা ও মহানগর পর্যায়ের একাধিক নেতা বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বেও রয়েছেন। ফলে দল পরিচালনার পাশাপাশি সরকারি দায়িত্ব পালনও তাদের করতে হচ্ছে। এই বাস্তবতায় তৃণমূলের প্রশ্ন মাঠের নেতা–কর্মীদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ, অভিযোগ যাচাই এবং দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর সাংগঠনিক ব্যবস্থা কতটা সক্রিয়?
কারণ স্থানীয় পর্যায়ে কোনো নেতা বা কর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি কিংবা দখলের অভিযোগ উঠলে সেটি শুধু ব্যক্তির বিষয় হিসেবে দেখলে তৃণমূলের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। আবার অভিযোগ প্রমাণের আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও রাজনৈতিকভাবে ও আইনগতভাবে সঠিক নয়।
নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি না করার বিষয়ে নেতা-কর্মীদের সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, কোনো ‘নন-ইস্যু’কে ইস্যু বানিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম করতে গিয়ে যেন ব্যবসায়ীদের ক্ষতি না হয়। এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ব্যবসা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সংঘাতের বিষয়টি দলের স্থানীয় নেতৃত্বের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সামনে তাই এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মীদের প্রত্যাশা পূরণ করা, অন্যদিকে দলের নাম ব্যবহার করে কেউ ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া। কারণ চাঁদাবাজি বা দখলের অভিযোগের সঙ্গে যখন দলীয় পদধারী ব্যক্তিদের নাম জড়িয়ে যায়, তখন ক্ষতি শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তির নয় প্রভাব পড়ে পুরো সংগঠনের ভাবমূর্তিতে।
সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায় ক্ষমতার পরিবর্তনের পর নারায়ণগঞ্জে বিএনপি কি শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মোকাবিলা করবে, নাকি নিজেদের দলের ভেতরে চাঁদাবাজি, দখল, সংঘর্ষ ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগের বিরুদ্ধেও কঠোর সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে?
সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার, বহিষ্কার ও অভিযোগের ধারাবাহিকতা বলছে, এই প্রশ্নটি এখন আর শুধু রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়; নারায়ণগঞ্জ বিএনপির জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক বাস্তবতা।

