দীর্ঘ প্রায় ১৩ মাস কারাবাসের পর জামিনে মুক্তি, এরপর কিছুটা নীরবতাসব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আলোচনার বাইরে ছিলেন সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তবে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সিদ্ধিরগঞ্জের রিকশাচালক তুহিন হত্যা মামলায় আদালতে হাজিরা দিয়ে বের হওয়ার সময় ‘জয় বাংলাকে দমিয়ে রাখা যাবে না’ মন্তব্য করে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছেন তিনি। তাঁর এই বক্তব্যকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আইভী নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তিনবারের নির্বাচিত সাবেক মেয়র এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। একসময় নগর রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা এই নেত্রীর সাম্প্রতিক উপস্থিতি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে এটি কি কেবল আইনি প্রক্রিয়ার অংশ, নাকি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরুর ইঙ্গিত?
২০২৫ সালের ৯ মে নারায়ণগঞ্জের দেওভোগে নিজ বাসভবন থেকে আইভীকে গ্রেপ্তার করা হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলাতেও তাঁকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।
দীর্ঘ প্রায় ১৩ মাস কারাবাসের পর ২০২৬ সালের ৩ জুন রাতে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান তিনি। তাঁর মুক্তির পর নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁকে ঘিরে নানা আলোচনা তৈরি হলেও পরবর্তী সময়ে তাঁর প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে তেমন কোনো বড় খবর সামনে আসেনি।
তবে কারামুক্তির পর তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ কর্মকৌশল নিয়ে কৌতূহল থেকেই যায়। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জেলা কমিটির সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি হিসেবে আইভীর ভূমিকা কী হবে, তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় দায়ের করা রিকশাচালক তুহিন হত্যা মামলায় নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হাজির হন আইভী। শুনানি শেষে আদালত তাঁর পুনরায় জামিন মঞ্জুর করেন। মামলাটিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় রিকশাচালক তুহিন নিহত হওয়ার ঘটনায় তাঁর স্ত্রী হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা করেছিলেন।
আইভীর আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, মামলার বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ধারায় তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছিলেন। ওই প্রতিবেদন নিয়ে শুনানির পাশাপাশি তাঁর পুনরায় জামিনের আবেদন করা হয়। আদালত শুনানি শেষে আবেদন মঞ্জুর করেন। তবে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এবং অভিযোগের বিষয়ে আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত আলাদা বিষয়।
আদালত থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে বিস্তারিত কথা না বললেও গাড়িতে ওঠার আগে আইভী বলেন, ‘জয় বাংলাকে দমিয়ে রাখা যাবে না।’ তাঁর এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
আইভীর রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি পদ। স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর নিজস্ব অবস্থান ও পরিচিতি রয়েছে। সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নগর উন্নয়ন, নাগরিক সেবা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের নানা ঘটনায় তিনি আলোচনায় এসেছেন।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। ওই সময় তাঁকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়রের পদ থেকেও অপসারণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে মামলায় গ্রেপ্তার ও কারাবাস তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন বাস্তবতা তৈরি করে।
বর্তমানে আইভী জেলা আওয়ামী লীগের কোনো সক্রিয় সাংগঠনিক পদে দায়িত্ব পালন করছেন কি না, সে বিষয়ে হালনাগাদ নিশ্চিত তথ্য নেই। তাই তাঁকে বর্তমান জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ।
আদালত প্রাঙ্গণে আইভীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিচয় বহনকারী একজন নেত্রীর মুখে এমন স্লোগানকে কেউ রাজনৈতিক অবস্থানের প্রকাশ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে তাঁর ব্যক্তিগত বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করছেন।
আইভীকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ায় তাঁর অনুসারীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কারামুক্তির পর তাঁর সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ নেতাকর্মীরা কতটা সক্রিয় হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে সাংগঠনিক যোগাযোগ রয়েছে কি না এবং ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি সামনে আসে কি না এসব বিষয়ে নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হচ্ছে।
দীর্ঘ কারাবাসের পর মুক্তি এবং এরপর আদালতে হাজিরা শেষে দেওয়া বক্তব্য এই দুই ঘটনাকে ঘিরে আইভী আবারও আলোচনায় এসেছেন। তবে তাঁর এই উপস্থিতি রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সূচনা কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
একদিকে রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর আইনি প্রক্রিয়া, অন্যদিকে রয়েছে আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং নারায়ণগঞ্জের পরিবর্তিত পরিস্থিতি। এসবের মধ্যে আইভী ভবিষ্যতে কী ভূমিকা নেবেন, তা নির্ভর করবে তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত, আইনি পরিস্থিতি এবং পরবর্তী কর্মকাণ্ডের ওপর।
সব মিলিয়ে, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে ঘিরে আলোচনা আবারও সামনে এসেছে। তবে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে তিনি নতুন কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির ইঙ্গিত দিয়েছেন কি না, তার উত্তর পেতে অপেক্ষা করতে হবে তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য।

