নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেত্রী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর আদালত প্রাঙ্গণে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সিদ্ধিরগঞ্জের তুহিন হত্যা মামলায় আদালতে হাজিরা দিয়ে পুনরায় জামিন পাওয়ার পর গাড়িতে ওঠার সময় তিনি ‘জয় বাংলাকে দাবিয়ে রাখা যাবে না’ বলে স্লোগান দেন। এ ঘটনাকে ঘিরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে তৎপরতা ও গ্রেপ্তার আতঙ্কের আলোচনা চলছে। এদিকে, ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছে এরা হলেন নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জিয়াউল ইসলাম কাজল, অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান তুষার ও আতিকুল ইসলাম।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। এর পরের বছর, ২০২৫ সালের ৯ মে, সিদ্ধিরগঞ্জে পোশাকশ্রমিক মিনারুল হত্যা মামলায় আইভীকে তাঁর দেওভোগের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী সময়ে হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
দীর্ঘ প্রায় ১৩ মাস কারাবাসের পর ২০২৬ সালের ৩ জুন রাতে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় নারী কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে থাকা ১২টি মামলায় জামিনসংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই শেষে মুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় ।
কারামুক্তির পর গতকাল ১৩ অক্টোবর সিদ্ধিরগঞ্জের তুহিন হত্যা মামলায় হাজিরা দিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে যান আইভী। মামলাটি ২০২৪ সালের ২০ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল এলাকায় রিকশাচালক তুহিন নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা হয়।
মামলার বাদী নিহত তুহিনের স্ত্রী আলেয়া আক্তার। মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমানকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এজাহারে আইভীকে ১১ নম্বর আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় নাম উল্লেখ করে মোট ৯৯ জনকে আসামি করা হয়। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ৩০০ জনকে আসামি করার কথা এজাহারে রয়েছে।
মামলার বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ধারায় তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছিলেন। ওই প্রতিবেদনসংক্রান্ত শুনানি ও আইভীর পুনরায় জামিনের আবেদন নিয়ে মঙ্গলবার আদালতে কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে জেলা ও দায়রা জজ আবু শামীম আজাদ তাঁর জামিনের আবেদন মঞ্জুর করেন। এ মামলায় এর আগে উচ্চ আদালত থেকেও জামিন পেয়েছিলেন তিনি।
আদালতের কার্যক্রম শেষে গাড়িতে ওঠার সময় আইভী বলেন, ‘জয় বাংলাকে দাবিয়ে রাখা যাবে না।’ এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজন নেতাকর্মীকেও স্লোগান দিতে দেখা যায় ।
সরকার পরিবর্তনের পর দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকা এবং বিভিন্ন মামলায় আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর আইভীর এ বক্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতা সীমিত থাকার প্রেক্ষাপটে তাঁর স্লোগানকে ঘিরে দলটির অনুসারীদের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে।
দলটির তৃণমূল পর্যায়ের কয়েকজন নেতাকর্মীর ভাষ্য, দীর্ঘদিন পর প্রকাশ্যে রাজনৈতিক স্লোগান ও মিছিলের মতো ঘটনা সামনে আসায় গ্রেপ্তারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ পুলিশি তৎপরতার ভয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন বলেও দাবি করা হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের রাজনীতি, বিশেষ করে সাবেক মেয়র আইভীর অনুসারীদের অবস্থান, দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয়। কারামুক্তির পর তাঁর আদালতে উপস্থিতি এবং প্রকাশ্যে রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়ার ঘটনা সেই আলোচনাকে আরও সামনে এনেছে।
একদিকে আইভীকে বিভিন্ন মামলায় আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, অন্যদিকে তাঁর বক্তব্য ও উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে দলটির অনুসারীদের মধ্যে রাজনৈতিক তৎপরতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে একটি স্লোগান বা বিচ্ছিন্ন মিছিলের ঘটনাকে দলটির সাংগঠনিক অবস্থান পরিবর্তনের নিশ্চিত ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, আইভীর প্রকাশ্য উপস্থিতি ও বক্তব্যের পর নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের তৎপরতায় কোনো পরিবর্তন আসে কি না এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়।

