নারায়ণগঞ্জের রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে পরিচিত মুখ অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপির রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে হামলা, মামলা ও কারাবরণের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, আইনজীবী অঙ্গনে নেতৃত্ব এবং সাত খুন মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে পরিচিতি তাঁকে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তন আসে। পরবর্তী সময়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পান সাখাওয়াত হোসেন খান। একই সঙ্গে তিনি নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্বেও রয়েছেন। ফলে দলীয় রাজনীতি, আইনজীবী অঙ্গন ও নগর প্রশাসন তিনটি ক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু দায়িত্ব পাওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, সাংগঠনিক সম্পর্ক এবং সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় সম্পৃক্ততা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতিতে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের দুই পক্ষের হাতাহাতির ঘটনায় তাঁর উপস্থিতি এবং তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিরোধ প্রশ্ন তুলেছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই নেতার চারপাশের পরিস্থিতি কি সঠিকভাবে সামাল দেওয়া হচ্ছে? কেউ কি তাঁকে ভুল পরামর্শ দিচ্ছেন, নাকি দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক বিরোধই তাঁকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি করছে?
সাখাওয়াত হোসেন খানের রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম দিক হলো আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বলে তাঁর রাজনৈতিক অনুসারীরা দাবি করে থাকেন। আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাজনৈতিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে প্রশাসকের দায়িত্ব পাওয়া তাঁর জন্য যেমন নতুন সুযোগ, তেমনি এটি নতুন ধরনের দায়িত্ব ও জবাবদিহির ক্ষেত্রও তৈরি করেছে। রাজপথের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং প্রশাসনিক দায়িত্বে থেকে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা এক বিষয় নয়। প্রশাসকের দায়িত্বে থেকে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা, নগরীর সমস্যা সমাধান এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে তাঁর প্রতি।
এমন বাস্তবতায় তাঁর প্রতিটি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পদক্ষেপ আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে দলীয় বিরোধ কিংবা পেশাগত অঙ্গনের কোনো বিরোধে তাঁর উপস্থিতি কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, সেটিও এখন আলোচনার বিষয়।
গত ৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির ভবনে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন আইনজীবী আহত হন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন সাখাওয়াত হোসেন খান। এ ঘটনায় তাঁকেও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় ।
আইনজীবী সমিতির আসন্ন নির্বাচন, নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ, সরকারি কৌঁসুলি নিয়োগ এবং আদালত স্থানান্তরের বিষয়সহ একাধিক ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে আগে থেকেই মতবিরোধ চলছিল। সেই বিরোধই একপর্যায়ে প্রকাশ্য উত্তেজনা ও হাতাহাতিতে রূপ নেয়। তবে ঘটনার জন্য দুই পক্ষের পক্ষ থেকেই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তোলা হয়েছে।
ঘটনার পর সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, তাঁকে অসম্মান করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং এ ঘটনার পেছনে কারও ইন্ধন থাকতে পারে। তাঁর এই বক্তব্যও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে কারা ইন্ধন দিয়েছেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কাউকে দায়ী করার সুযোগ নেই।
নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সাখাওয়াত হোসেন খান কি তাঁর চারপাশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারছেন, নাকি ঘনিষ্ঠ মহলের কারও পরামর্শ তাঁকে এমন কিছু পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যা তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অর্জন ও ভাবমূর্তির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে?
আইনজীবী অঙ্গনে সাখাওয়াত হোসেন খান ও সদর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এইচ এম আনোয়ার প্রধানের মধ্যে একসময় ঘনিষ্ঠ সাংগঠনিক সম্পর্ক ছিল । বর্তমানে তাঁদের মধ্যে দূরত্ব ও বিরোধের বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। আইনজীবী সমিতির আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নেতৃত্বের প্রশ্নও এই বিরোধের অন্যতম প্রেক্ষাপট হিসেবে উঠে এসেছে।
আইনজীবী সমিতির নেতৃত্ব, সভাপতি পদে সম্ভাব্য প্রার্থিতা এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক বিষয়ে মতবিরোধ। ফলে ঘটনাটিকে কেবল একটি দিনের হাতাহাতি হিসেবে দেখলে এর পেছনের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন আড়ালে থেকে যেতে পারে। তবে এই বিরোধের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি সাখাওয়াতকে ভুল পথে পরিচালিত করছেন কি না এটা নিয়ে আদালত পাড়ায় ব্যাপক আলোচনা।
সাখাওয়াত হোসেন খানের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা বা আইনজীবী নন, তিনি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকও। নগর প্রশাসনের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নাগরিকদের প্রত্যাশা এবং রাজনৈতিক সংগঠনের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দলের প্রত্যাশা দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আইনজীবী সমিতির মতো পেশাগত অঙ্গনে বিরোধ সৃষ্টি হলে তা সমাধানে সংলাপ, পারস্পরিক সম্মান এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো, বিরোধ যেন ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ না নেয়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া।
রাজনৈতিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসা একজন নেতার ক্ষেত্রে জনমনে প্রত্যাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। সাখাওয়াত হোসেন খানের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। আইনজীবী সমিতির সাম্প্রতিক ঘটনা তাঁর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা বাড়িয়েছে। এখন তাঁর সামনে চ্যালেঞ্জ হলো, বিরোধের মধ্যে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে সাখাওয়াত হোসেন খানের পরবর্তী পদক্ষেপ তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি কি বিরোধ নিরসনে সমন্বয় ও সংলাপের পথে এগোবেন, নাকি আইনজীবী অঙ্গনের দ্বন্দ্ব আরও দীর্ঘায়িত হবে সেদিকেই এখন নজর থাকবে রাজনৈতিক ও পেশাজীবী মহলের।

