নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির রাজনীতিতে একসময় গুরু-শিষ্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান ও অ্যাডভোকেট এইচ এম আনোয়ার প্রধান। একই রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী এই দুই আইনজীবীর সম্পর্ক একসময় ছিল ঘনিষ্ঠ। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই সম্পর্কের জায়গায় তৈরি হয়েছে দূরত্ব, নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রকাশ্য বিরোধ। সর্বশেষ আদালতপাড়ায় দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও হাতাহাতির ঘটনায় সেই বিরোধ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
আইনজীবী অঙ্গনে এখন প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযাত্রা ও আন্দোলন-সংগ্রামের সম্পর্ক কীভাবে এমন অবস্থায় পৌঁছাল? আর এই বিরোধের অবসান কবে হবে? সাধারণ আইনজীবীদের প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে আদালতপাড়ায় পেশাগত পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হোক।
নারায়ণগঞ্জের বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের রাজনীতিতে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত মুখ। তিনি জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দুই পদেই দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যদিকে, অ্যাডভোকেট এইচ এম আনোয়ার প্রধানও আইনজীবী রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন এবং বর্তমানে জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন।
আইন পেশায় আনোয়ার প্রধানের উত্থানের সময় সাখাওয়াত হোসেন খানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল। আইনজীবী অঙ্গনে তাঁদের সম্পর্ক গুরু-শিষ্য হিসেবে পরিচিতি পায়। তবে বারের নেতৃত্ব ও আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেই সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি ও দলীয় রাজনীতির পরিমণ্ডলে দীর্ঘদিনের পথচলা তাঁদের একই রাজনৈতিক বলয়ে নিয়ে এলেও বর্তমানে আইনজীবী সমিতির নেতৃত্ব নিয়ে তাঁদের অবস্থান ভিন্ন। ফলে অতীতের রাজনৈতিক সহযাত্রার তুলনায় বর্তমান বিরোধ আরও বেশি আলোচনায় এসেছে।
আসন্ন জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সভাপতি পদে প্রার্থী হওয়া নিয়ে সাখাওয়াত হোসেন খান ও আনোয়ার প্রধানের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। সাখাওয়াত হোসেন খানের বক্তব্য অনুযায়ী, আগে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিদের একই পদে পুনরায় প্রার্থী না হওয়ার বিষয়ে তাঁদের মধ্যে সমঝোতা ছিল। অন্যদিকে আনোয়ার প্রধানের বক্তব্য, বারের নেতৃত্ব একটি পক্ষের নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রবণতা রয়েছে।
এ ছাড়া আদালত-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য এবং পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) নিয়োগ নিয়েও বিরোধের কথা বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে এসেছে। তবে এসব বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। ফলে বিরোধের কারণ নির্ধারণে উভয় পক্ষের বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক নথি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বর্তমানে একদিকে রয়েছেন সাখাওয়াত হোসেন খান ও আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ুন কবিরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আইনজীবীদের একটি অংশ। অন্যদিকে রয়েছেন আনোয়ার প্রধান ও পিপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকিরের অনুসারীরা। এই বিভক্তি আদালতপাড়ার স্বাভাবিক পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
গত ৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনের দ্বিতীয় তলায় বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি, ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খানকে হেনস্তা করার অভিযোগ ওঠে। অন্যদিকে, পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির ও অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক নয়নসহ কয়েকজন আইনজীবী আহত হন ।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, সমিতির ভবনে দুই পক্ষের অবস্থান, আসন্ন নির্বাচন এবং বিভিন্ন পেশাগত বিষয়ে মতবিরোধের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি হাতাহাতিতে রূপ নেয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ঘটনার পর দুই পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে। আনোয়ার প্রধানের অভিযোগ, সাখাওয়াত হোসেন ও তাঁর অনুসারীরা তাঁদের ওপর চড়াও হয়েছিলেন। অন্যদিকে সাখাওয়াত হোসেন অভিযোগ করেন, তাঁকে উদ্দেশ করে অশোভন মন্তব্য করা হয়েছে এবং তাঁকে হেনস্তা করা হয়েছে। সমিতির সভাপতি সরকার হুমায়ুন কবিরও ঘটনার বিষয়ে নিজের বক্তব্য দিয়েছেন। ফলে সংঘর্ষের দায় নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত ও উভয় পক্ষের বক্তব্য বিবেচনা করা জরুরি।
নারায়ণগঞ্জে বিএনপির রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম, হরতাল-অবরোধ এবং বিভিন্ন কর্মসূচিতে আইনজীবীদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ছিল। সাখাওয়াত হোসেন খান ও আনোয়ার প্রধান দুজনই বিএনপিপন্থী আইনজীবী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় বিচার ও দায়ীদের বিচারের দাবিতে আইনজীবীদের আন্দোলনে সাখাওয়াত হোসেন খান নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এ ঘটনায় তিনি দেশব্যাপী পরিচিতি পান। অন্যদিকে, আনোয়ার প্রধানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় হরতাল-অবরোধ ও মশাল মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। অতীতের এসব আন্দোলন-সংগ্রামে অবদান রাখা নেতাদের মধ্যেই আজ নেতৃত্বের প্রশ্নে দূরত্ব তৈরি হওয়ায় আইনজীবীদের একাংশের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। তাঁদের দৃষ্টিতে, রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সময়ে সহযাত্রা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার যে সম্পর্ক ছিল, বর্তমান বিরোধে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
তবে অতীতের আন্দোলনে কার কী ভূমিকা ছিল, তার ভিত্তিতে বর্তমান বিরোধের দায় নির্ধারণ করা যায় না। বরং নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা যেন ব্যক্তিগত বিরোধে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, আগের দায়িত্ব পালনের পর একই পদে পুনরায় প্রার্থী হওয়া নিয়ে তাঁদের মধ্যে সমঝোতার বিষয় ছিল। আনোয়ার প্রধানের বক্তব্য, বারের নেতৃত্ব ও পেশাগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে একটি পক্ষের প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা রয়েছে। আদালত স্থানান্তর এবং পিপি নিয়োগের বিষয়েও দুই পক্ষের অবস্থান এক নয়।
এসব বিষয়ে মতবিরোধ থাকতেই পারে। কিন্তু নির্বাচন, নিয়োগ কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মতপার্থক্য আলোচনার পরিবর্তে হাতাহাতিতে গড়ালে তার প্রভাব পুরো আইনজীবী সমাজের ওপর পড়ে। বিশেষ করে আদালতপাড়ায় আইনজীবীদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হলে পেশাগত সম্পর্ক, সমিতির কার্যক্রম এবং বিচারপ্রার্থীদের কাছে আইনজীবী সমাজের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
গুরু-শিষ্যের সম্পর্কের এই বিরোধ এখন কেবল দুই ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব পড়েছে আইনজীবী সমিতির নেতৃত্ব ও বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের সাংগঠনিক পরিবেশে। দুই পক্ষের অনুসারীদের পৃথক অবস্থানও সেই বিভক্তিকে দৃশ্যমান করছে।
সাধারণ আইনজীবীদের প্রত্যাশা, সাখাওয়াত হোসেন খান ও আনোয়ার প্রধান নিজেদের মধ্যকার বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করবেন। সমিতির নেতৃত্ব নির্বাচন, পিপি নিয়োগ কিংবা আদালত স্থানান্তরের মতো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়মনীতি, স্বচ্ছতা ও সংশ্লিষ্টদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
যাঁরা একসময় একই রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাস রেখে আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের বিরোধের কারণে আইনজীবী সমাজে স্থায়ী বিভাজন তৈরি হোক এমনটি চান না অনেকেই। তাঁদের প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে উঠে পেশাগত মর্যাদা, পারস্পরিক সম্মান ও আইনজীবীদের ঐক্য ফিরিয়ে আনা হবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই গুরু-শিষ্যের এই দ্বন্দ্ব কি নেতৃত্বের প্রতিযোগিতাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা আইনজীবী সমাজের বৃহত্তর ঐক্যকে আরও দুর্বল করবে? বিরোধের অবসান ঘটিয়ে আদালতপাড়ায় স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব এখন সংশ্লিষ্ট নেতৃত্বেরই।

