নারায়ণগঞ্জের বন্দর রাজনীতিতে একটি নাম যেন বারবারই ফিরে আসে আতাউর রহমান মুকুল। কখনো দলীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী নেতা হিসেবে, কখনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের তীব্র সমালোচনার মুখে, কখনো প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে, আবার কখনো নিজ দল বিএনপির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে আলোচনায় থেকেছেন তিনি।
বহু বছর ধরে বন্দরের রাজনীতিতে মুকুলকে ঘিরে বিতর্কের যেন শেষ নেই। একটি বিতর্ক শেষ হওয়ার আগেই সামনে এসেছে আরেকটি ঘটনা। দলীয় পদ-পদবি, নির্বাচনী অবস্থান, বহিষ্কার, পুনর্বহাল সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার অনেকটাই ঘটনাবহুল।
আর এবার নতুন করে সেই আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে তাঁর একটি বক্তব্য ‘কালো হাতের ছায়া’। বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মহানগর বিএনপির আয়োজিত অনুষ্ঠানে নিজের রাজনৈতিক অতীতের প্রসঙ্গ টেনে মুকুল ‘কালো হাতের ছায়া’র কথা বলার পর থেকেই নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা। তিনি কার দিকে ইঙ্গিত করেছেন, সেই প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বিএনপির রাজনীতিতে।
তাঁর বক্তব্যের পর সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে, তা হলো মুকুলের নিজের রাজনৈতিক অতীতই কি তাঁর বর্তমান বক্তব্যের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত? নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ওসমান পরিবারের প্রভাব দীর্ঘদিনের। সেই প্রভাববলয়ের সঙ্গে আতাউর রহমান মুকুলের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও নতুন নয়।
২০১৪ সালের নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপনির্বাচন থেকেই বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলেও মুকুলকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী একেএম সেলিম ওসমানের পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা যায় এমন তথ্য বিভিন্ন সময়ের সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এমনকি নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা নিয়েও তখন আলোচনা হয়।
বিএনপির একজন নেতার দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়া তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করেছিল। আর সেই প্রশ্নই পরবর্তী বছরগুলোতে মুকুলের রাজনৈতিক পরিচয় ও অবস্থান নিয়ে নানা বিতর্কের ভিত্তি তৈরি করে।
মুকুলকে ঘিরে বিতর্কের আরেকটি অধ্যায় তৈরি হয় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাঁর উপস্থিতি নিয়ে।২০১৪ সালের একটি বিজয় র্যালিতে আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে তাঁর উপস্থিতির বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন নেতাকে আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে দেখা যাওয়াকে কেন্দ্র করে তখন তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন প্রতিপক্ষরা। পরবর্তী সময়েও ওসমান পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা অব্যাহত থাকে।
তবে মুকুলের অনুসারীদের বরাবরের দাবি রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ককে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। পুরনো বিতর্কগুলোকে ছাড়িয়ে ২০২৩ সালে মুকুলের রাজনৈতিক জীবনে বড় ধাক্কা আসে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী সেলিম ওসমানের নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে বিএনপি তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে।
দলের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ আনা হয়। প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলের সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক শাস্তিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
একসময় বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় এই নেতাই তখন দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে দলের বাইরে চলে যান। কিন্তু মুকুলের রাজনৈতিক গল্প এখানেই শেষ হয়নি। দীর্ঘ প্রায় ২৩ মাস পর বিএনপি তাঁর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে দলীয় সিদ্ধান্তে তাঁর প্রাথমিক সদস্যপদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের পর আবারও বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি।
রাজনৈতিকভাবে এটি ছিল মুকুলের জন্য বড় প্রত্যাবর্তন। কারণ, যে দল থেকে একসময় বহিষ্কৃত হয়েছিলেন, সেই দলই পরবর্তীতে তাঁকে আবার নিজেদের রাজনৈতিক পরিসরে ফিরিয়ে নেয়। আর এখানেই তৈরি হয় নতুন প্রশ্ন দলের সঙ্গে তাঁর পুরনো বিরোধ কি শেষ হয়ে গেছে? নাকি পুরনো দ্বন্দ্বের কোনো কোনো অধ্যায় এখনো বিএনপির অভ্যন্তরে সক্রিয়?
২০২৫ সালের জুনে বন্দর এলাকায় মুকুলকে লাঞ্ছিত করার একটি ঘটনা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আবারও আলোচনার জন্ম দেয়। ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক ক্ষোভ ও অতীতের কর্মকাণ্ডের বিষয় সামনে আসে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তাঁকে ঘিরে ‘ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ’এমন অভিযোগও তখন নতুন করে সামনে আসে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মুকুলপন্থীদের অবস্থান ছিল ভিন্ন। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা পরিকল্পিতভাবে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে। ফলে মুকুলকে ঘিরে বিতর্কের পাশাপাশি পাল্টা অভিযোগও কম নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে মুকুলের বক্তব্য নতুন করে সেই পুরনো রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো সামনে নিয়ে এসেছে।
তিনি যখন নিজের রাজনৈতিক অতীতের প্রসঙ্গে ‘কালো হাতের ছায়া’র কথা বলেন, তখন উপস্থিত নেতাকর্মী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যেও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—এই ‘কালো হাত’ আসলে কার?
কেউ মনে করছেন, তিনি অতীতে নিজের ওপর থাকা কোনো রাজনৈতিক প্রভাবের কথা বলেছেন। আবার কারও ধারণা, বর্তমান বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোনো রাজনৈতিক শক্তির প্রতিই তিনি ইঙ্গিত করেছেন। আরেকটি পক্ষ মনে করছে, নিজের রাজনৈতিক অতীতের বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর ব্যাখ্যা দিতেই মুকুল এমন বক্তব্য দিয়েছেন।
তবে তিনি নির্দিষ্ট করে কারও নাম না বলায় জল্পনা আরও বেড়েছে। মুকুলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট—তিনি বারবার রাজনৈতিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে মাঠে ফিরে এসেছেন।
একদিকে ওসমান পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ, অন্যদিকে বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা; একদিকে দলীয় বহিষ্কার, অন্যদিকে সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে পুনরায় দলে ফেরা—সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
তবে মুকুলের সমর্থকদের বক্তব্য, এসব বিতর্কের বড় একটি অংশই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রচারণা। তাঁদের মতে, মুকুল দীর্ঘদিন ধরে বন্দরের বিএনপির রাজনীতিতে মাঠের নেতা হিসেবে সক্রিয় এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের সঙ্গেই রয়েছেন।
অন্যদিকে সমালোচকদের প্রশ্ন যদি অতীতের বিতর্কগুলো রাজনৈতিকভাবে ভুল বোঝাবুঝি হয়, তাহলে বারবার একই ধরনের অভিযোগ কেন সামনে আসে?
মুকুলের সর্বশেষ বক্তব্যের পর এখন সবচেয়ে বেশি যে আলোচনা, সেটি হলো ‘কালো হাত’ কি তাঁর নিজের রাজনৈতিক অতীতের কোনো অধ্যায়ের ইঙ্গিত, নাকি বিএনপির বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কোনো অদৃশ্য শক্তির নাম?
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে মুকুলের দীর্ঘ পথচলা বলছে, তাঁকে ঘিরে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। কারণ, এবার তিনি নিজেই এমন একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন, যার ব্যাখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
আর সেই প্রশ্নের উত্তর না মেলা পর্যন্ত বন্দরের রাজনীতিতে ‘কালো হাতের ছায়া’ প্রসঙ্গটি যে আরও কিছুদিন আলোচনায় থাকবে, তা বলাই যায়। আতাউর রহমান মুকুল রাজনীতির মাঠে বিতর্কিত, নাকি বিতর্কের মধ্যেও টিকে থাকা এক রাজনৈতিক চরিত্র?
এই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। তবে এটুকু নিশ্চিত, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে মুকুলের নাম আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। আর তাঁর ‘কালো হাতের ছায়া’ মন্তব্য পুরনো রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশকে নতুন করে সামনে এনে বন্দরের রাজনীতির মাঠকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।

