দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-হামলা আর নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে রাজপথে সক্রিয় থাকা নারায়ণগঞ্জ বিএনপির তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে এখন দেখা দিয়েছে হতাশা ও ক্ষোভ। দল রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও তৃণমূলের সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্বের কাঙ্ক্ষিত যোগাযোগ তৈরি হয়নি এমন অভিযোগ রয়েছে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে। অনেকের দাবি, বিরোধী দলে থাকাকালে যাদের নিয়ে রাজপথে কর্মসূচি হয়েছে, ক্ষমতায় আসার পর তাদের অনেকেই এখন দলীয় নেতৃত্বের কাছ থেকে দূরে সরে পড়েছেন।
চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করার পর ইতোমধ্যে ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। সরকারের প্রথম ছয় মাস নিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে নানা সাফল্য ও সীমাবদ্ধতার হিসাব তুলে ধরা হলেও নারায়ণগঞ্জের সাংগঠনিক রাজনীতিতে তৃণমূলের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের একটি অংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন রাজপথে থাকা কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, সাংগঠনিক কর্মসূচি কিংবা মতবিনিময়ের বদলে অনেক ক্ষেত্রেই নেতৃত্বকেন্দ্রিক রাজনীতি গুরুত্ব পাচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করছেন, দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে তৃণমূলের মতামত আগের মতো গুরুত্ব পাচ্ছে না।
বিএনপি দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে থাকার সময় নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা মামলা, গ্রেপ্তার, হামলা ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। নির্বাচনের সময়ও জেলার নেতাকর্মীরা মাঠে সক্রিয় ছিলেন। নারায়ণগঞ্জে বিএনপির নির্বাচনী সমাবেশে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপস্থিতিও ছিল।
কিন্তু সরকার গঠনের পর সেই তৃণমূল কর্মীদের অনেকের প্রত্যাশা ছিল সাংগঠনিক পুনর্মূল্যায়ন, নিয়মিত যোগাযোগ এবং মাঠপর্যায়ে নেতৃত্বের সুযোগ বাড়বে। বাস্তবে অনেকে এখনো নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।
তৃণমূলের অভিযোগের বড় জায়গা হলো কেন্দ্রীয় বা শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো নেতাকর্মীর ভাষ্য, আগে কর্মসূচি উপলক্ষে নেতাদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ থাকলেও এখন অনেক ক্ষেত্রে শীর্ষ নেতাদের কাছে পৌঁছানোই কঠিন। এতে তৃণমূলের একটি অংশের মধ্যে তৈরি হয়েছে বৈষম্যের অনুভূতি। তাদের প্রশ্ন দলের কঠিন সময়ে যারা মাঠে ছিলেন, তাদের রাজনৈতিক মূল্যায়ন কোথায়?
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করছেন, ক্ষমতার সঙ্গে দলের সাংগঠনিক কাঠামোর দূরত্ব তৈরি হলে ভবিষ্যতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ মাঠপর্যায়ে সক্রিয় কর্মী ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দলই দীর্ঘমেয়াদে সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখতে পারে না।
নারায়ণগঞ্জ বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা খুব বেশি নয় তারা চান নিয়মিত সাংগঠনিক কর্মসূচি, নেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, যোগ্যতা ও ত্যাগের ভিত্তিতে মূল্যায়ন এবং ইউনিট পর্যায়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব নির্বাচন।
তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে যারা দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, তাদের বাদ দিয়ে শুধু ক্ষমতার সময় সামনে আসা ব্যক্তিদের গুরুত্ব দেওয়া হলে দলের ভেতরে ক্ষোভ তৈরি হতে পারে।
ক্ষমতায় থাকার সময়ই বিএনপির সামনে সংগঠনকে শক্তিশালী করার বড় সুযোগ রয়েছে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে যদি তৃণমূলের সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্বের দূরত্ব বাড়তে থাকে, কমিটি নিয়ে অনিশ্চয়তা চলতে থাকে এবং দীর্ঘদিনের কর্মীদের মূল্যায়নের অভিযোগ অব্যাহত থাকে, তাহলে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ছয় মাসের এই সময়ে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতার রাজনীতিতে শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তৃণমূলের দূরত্ব কি কমবে, নাকি দীর্ঘদিনের রাজপথের কর্মীরাই থেকে যাবেন অপেক্ষায়?
কারণ বিএনপির আগামী দিনের রাজনৈতিক শক্তি শুধু সংসদ বা সরকারের ক্ষমতার কেন্দ্রে নয়; এর প্রকৃত ভিত্তি রয়েছে সেই তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ওপর, যারা দীর্ঘদিন দলকে মাঠে টিকিয়ে রেখেছেন।

