একসময় আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক দৃশ্যপট এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। দীর্ঘদিনের ক্ষমতার পালাবদলের পর জেলার রাজনীতিতে বিএনপি এখন সবচেয়ে দৃশ্যমান ও সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় শক্তি। বিপরীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের বড় একটি অংশ আত্মগোপনে বা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। ফলে রাজপথ থেকে সংসদ সব ক্ষেত্রেই আওয়ামী লীগের জায়গায় বিএনপির প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি আসার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির ভেতরের বিভক্তি, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা ও স্থানীয় প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্বও সামনে আসছে।
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটিতে বিএনপির প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে নজরুল ইসলাম আজাদ, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে আজহারুল ইসলাম মান্নান এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে আবুল কালাম নির্বাচিত হন। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জয় পান বিএনপি-সমর্থিত জোটের প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল আমিন। ফলে জেলার পাঁচটি আসনই বিএনপি ও তাদের জোটের নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
এই ফলাফল নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। কারণ এর আগে জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে একাধিক আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য ধরে রেখেছিলেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগের গোলাম দস্তগীর গাজী জয়ী হয়েছিলেন।
নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ওসমান পরিবার, গোলাম দস্তগীর গাজী, সেলিনা হায়াৎ আইভীসহ একাধিক প্রভাবশালী নাম জড়িয়ে ছিল। বিশেষ করে শামীম ওসমানকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে উঠেছিল। অন্যদিকে আইভীকে ঘিরে আওয়ামী লীগের আরেকটি পৃথক রাজনৈতিক ধারা ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে এই দুই বলয়ের দ্বন্দ্বও জেলার রাজনীতিতে আলোচিত ছিল।
কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই চিত্র বদলে গেছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর জেলার শীর্ষ নেতাদের বড় অংশ প্রকাশ্যে নেই। শামীম ওসমানসহ দলের একাধিক শীর্ষ নেতার আত্মগোপনে বা দেশের বাইরে থাকার কথা উঠে এসেছে। সাবেক মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী গ্রেপ্তার হয়ে মামলার মুখোমুখি হয়েছেন বলেও প্রতিবেদন রয়েছে।
ফলে একসময় যেসব এলাকায় আওয়ামী লীগের বড় বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি, মিছিল-সমাবেশ ও সাংগঠনিক তৎপরতা নিয়মিত দেখা যেত, সেসব এলাকায় এখন দলটির প্রকাশ্য সাংগঠনিক উপস্থিতি অনেকটাই অনুপস্থিত।
দীর্ঘ সময় বিরোধী রাজনীতিতে থাকা নারায়ণগঞ্জ বিএনপি এখন ক্ষমতাসীন দলের অবস্থানে। সংসদে জেলার চারটি আসনে বিএনপির সরাসরি প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক-সাংগঠনিক পরিসরেও বিএনপিপন্থী নেতাদের উপস্থিতি বাড়ছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে আলোচনা রয়েছে।
নির্বাচনের আগে জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতারা প্রার্থীদের পক্ষে ব্যাপকভাবে মাঠে সক্রিয় ছিলেন। জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুকুল ইসলাম রাজীব, মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফতেহ মোহাম্মদ রেজা রিপন, মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
তবে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন ক্ষমতার রাজনীতিতে নিজেদের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।
নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে দীর্ঘদিন ধরেই একাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয় রয়েছে। জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতৃত্ব, সংসদীয় আসনভিত্তিক রাজনীতি, থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটি এবং বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে নেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে।
ফতুল্লা, সদর, বন্দর, সিদ্ধিরগঞ্জ, সোনারগাঁ ও রূপগঞ্জ প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই স্থানীয় নেতৃত্বের নিজস্ব প্রভাববলয় রয়েছে। নির্বাচনের আগে এসব বলয়ের মধ্যে মনোনয়নকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতাও প্রকাশ্যে আসে। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে একাধিক বিএনপি নেতা ও সাবেক নেতা নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ায় সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল বিশেষভাবে আলোচিত।
স্থানীয় রাজনীতি নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা ও চেইন অব কমান্ডের দুর্বলতার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ এখন দৃশ্যমানভাবে অনেকটাই দুর্বল হলেও নারায়ণগঞ্জে দলটির পুরোনো সাংগঠনিক ভিত্তি পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে জেলার বিভিন্ন পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছিল।
শিল্পাঞ্চল, শ্রমিক সংগঠন, ব্যবসায়ী মহল এবং স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক কাঠামোতে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের প্রভাব ছিল। তবে বর্তমানে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত থাকায় সেই নেটওয়ার্ক কতটা সক্রিয় এবং ভবিষ্যতে তারা কীভাবে রাজনীতিতে ফিরবে তা নির্ভর করবে জাতীয় রাজনীতির গতিপথ ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পুনর্গঠনের ওপর।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়নি। ফলে নির্বাচনী ফলাফলে দলটির জনপ্রিয়তার বর্তমান বাস্তব চিত্র সরাসরি পরিমাপ করার সুযোগও তৈরি হয়নি।
নারায়ণগঞ্জে বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক শক্তিকে রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে সমন্বয় করে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা। কিন্তু একই সঙ্গে ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে নেতাদের কর্মকাণ্ড, প্রভাব বিস্তার, দলীয় শৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও বেশি নজরদারির মধ্যে পড়ছে।
ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানীয় প্রতিবেদনে বিএনপি নেতাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা, বিভিন্ন বলয়ের মধ্যে বিরোধ এবং নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার কথা উঠে এসেছে।
অর্থাৎ আওয়ামী লীগের দুর্বলতার ফলে বিএনপি যে রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছে, সেই সুবিধাকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে হলে দলটির জন্য অভ্যন্তরীণ ঐক্য ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আরেকটি পরিবর্তন হলো বিএনপি বনাম আওয়ামী লীগের পুরোনো দ্বিমুখী সমীকরণের জায়গায় এখন বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ একাধিক রাজনৈতিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি-সমর্থিত জোটের প্রার্থী জয় পেলেও অন্যান্য আসনে জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল।
ফলে আগামী দিনের নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি শুধু আওয়ামী লীগ-বিএনপি দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিএনপির অভ্যন্তরীণ বলয়, জামায়াতের সাংগঠনিক বিস্তার, এনসিপির নতুন রাজনৈতিক অবস্থান এবং স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা সবকিছু মিলিয়েই নতুন সমীকরণ তৈরি হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জে বিএনপি নিঃসন্দেহে সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থানে রয়েছে। পাঁচটি সংসদীয় আসনের চারটিতে সরাসরি জয় এবং একটি আসনে জোটের প্রার্থীর জয় দলটির নির্বাচনী শক্তি স্পষ্ট করেছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের জন্য এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকা, শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি এবং রাজনৈতিকভাবে নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া।
তবে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি ঐতিহাসিকভাবেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবার, শিল্প-বাণিজ্যিক স্বার্থ ও স্থানীয় সংগঠনের ওপর নির্ভরশীল। তাই আগামী দিনে আওয়ামী লীগ কীভাবে নিজেদের পুনর্গঠন করে, বিএনপি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কতটা সামাল দিতে পারে এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলো কতটা জায়গা করে নিতে পারে—তার ওপরই নির্ভর করবে নারায়ণগঞ্জের পরবর্তী রাজনৈতিক চিত্র।
এক কথায়, নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের আধিপত্যের অধ্যায় আপাতত থেমে গেছে; বিএনপি উঠে এসেছে কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে। কিন্তু বিএনপির সামনে এখন প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার চেয়ে নিজেদের ভেতরের রাজনৈতিক ভারসাম্য ধরে রাখাই বড় পরীক্ষা।

