নারায়ণগঞ্জের আদালত স্থানান্তর নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে যখন উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই জেলা আইনজীবী সমিতির জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট শাখাওয়াত হোসেন খান, বর্তমান সভাপতি অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ুন কবির এবং অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুর অনুপস্থিতি নিয়ে আদালতপাড়ায় শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
সোমবার (২৪ আগস্ট) বিকেল ৩টায় নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনের তৃতীয় তলায় আদালত স্থানান্তর ইস্যুতে জরুরি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল বারী ভূঁইয়া, জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির, জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল গাফ্ফার, যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শামসুর নূর বাঁধন, জেলা আইনজীবী সমিতির যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট এ কে এম ওফর ফারুক নয়ন, অ্যাডভোকেট শেখ আনজুম আহমেদ রিফাতসহ সমিতির অন্যান্য আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।
তবে সংবাদ সম্মেলনে শাখাওয়াত হোসেন খান, সরকার হুমায়ুন কবির ও আবু আল ইউসুফ খান টিপুকে দেখা যায়নি। আর এ অনুপস্থিতিই এখন আদালতপাড়ার আইনজীবীদের মধ্যে আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে।
এর আগে ২০ আগস্টও নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত পৃথক স্থানে স্থানান্তরের উদ্যোগের প্রতিবাদ জানিয়ে আইনজীবীদের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সেখানে বর্তমান আদালত প্রাঙ্গণেই সমন্বিত জুডিশিয়াল কমপ্লেক্স নির্মাণের দাবি জানানো হয়।
আদালত স্থানান্তর ইস্যুতে শাখাওয়াত হোসেন খানের সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ২৩ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে থাকা সব আদালত একসঙ্গে অন্যত্র স্থানান্তর করা হবে না; তবে সাইবার কোর্ট, বিদ্যুৎ কোর্ট, নারী ও শিশু আদালতসহ কয়েকটি আদালত স্থানান্তরের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে আইনজীবীদের ঐক্য ধরে রাখার কথাও বলেন তিনি।
অন্যদিকে, ২৪ আগস্টের সংবাদ সম্মেলনে জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এইচ এম আনোয়ার প্রধানের বক্তব্য ছিল, আদালত স্থানান্তর নিয়ে এখন পর্যন্ত সরকারের কোনো আদেশ, নির্দেশনা বা প্রজ্ঞাপন আইনজীবী সমিতির কাছে আসেনি। তিনি বলেন, ল্যান্ডস কোর্ট, সাইবার কোর্ট, বিদ্যুৎ কোর্ট ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল কালীরবাজারের নতুন ভবনে স্থানান্তর নিয়ে আলোচনা থাকলেও এ বিষয়ে সমিতির কাছে কোনো সরকারি প্রস্তাব আসেনি।
আনোয়ার প্রধানের দাবি, বর্তমান আদালত ভবনেই এসব আদালতের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে। প্রয়োজনে বিদ্যমান অবকাঠামোর মধ্যেই জায়গার ব্যবস্থা করে আদালতগুলোর কার্যক্রম চালানো সম্ভব।
আইনজীবীদের পক্ষ থেকে আদালত স্থানান্তরের বিরোধিতায় চাষাড়া এলাকার যানজটকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের মতে, চাষাড়া নারায়ণগঞ্জ শহরের অন্যতম ব্যস্ত ও যানজটপূর্ণ এলাকা। আদালতের কার্যক্রম এক স্থান থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হলে আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে।
এ কারণে আইনজীবীদের একটি অংশ বর্তমান আদালত প্রাঙ্গণেই সব আদালতের জন্য সমন্বিত অবকাঠামো তৈরির দাবি জানিয়ে আসছেন।
আদালত স্থানান্তর নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মাধ্যমে নানা ধরনের তথ্য ছড়িয়ে পড়লেও জেলা আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এখনো কোনো সরকারি প্রজ্ঞাপন বা চূড়ান্ত নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আনোয়ার প্রধান বলেন, ‘আমরা কোনো বিভ্রান্তির ফাঁদে পা দেব না।’ আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় জেলা আইনজীবী সমিতি অতীতেও ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে—এমন অবস্থানও তিনি তুলে ধরেন।
তবে একই ইস্যুতে আইনজীবী সমিতির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতার অনুপস্থিতি এবং নেতাদের বক্তব্যের ভিন্নতা নিয়ে আদালতপাড়ায় প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে সমিতির বর্তমান সভাপতি সরকার হুমায়ুন কবির ও সাবেক সভাপতি শাখাওয়াত হোসেন খানসহ প্রভাবশালী আইনজীবীদের অবস্থান নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।
এখন দেখার বিষয়, আদালত স্থানান্তর নিয়ে সরকারিভাবে কোনো সিদ্ধান্ত বা প্রজ্ঞাপন আসে কি না এবং এলে নারায়ণগঞ্জের আইনজীবী সমাজের নেতারা শেষ পর্যন্ত কী ধরনের সম্মিলিত অবস্থান গ্রহণ করেন।
আদালত স্থানান্তর নিয়ে আইনজীবীরা সরব, নীরব শাখাওয়াত-হুমায়ুন-টিপু
Leave a Comment

