দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের পলাতক সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা এ কে এম শামীম ওসমান। গত ৯ আগস্ট নিউইয়র্কে একটি দোয়া মাহফিলে তার বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। এরপর ১৪ ও ১৫ আগস্ট নিউইয়র্কে আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও তার উপস্থিতি ও বক্তব্যের খবর প্রকাশিত হয়।
শামীম ওসমানের এই প্রকাশ্য তৎপরতা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং দলটির নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিষয়ে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
৯ আগস্ট নিউইয়র্কে দেওয়া বক্তব্যে শামীম ওসমান ‘আমি ব্যর্থ’ বলার পাশাপাশি নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বানের জানান।বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও প্রতিবেদনে তাকে নিজের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন এবং অতীতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করতে দেখা যায় বক্তব্যে তিনি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং নারায়ণগঞ্জে তার পারিবারিক বাড়ি বায়তুল আমান নিয়েও কথা বলেন । এসব বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ-বিরোধী রাজনৈতিক মহলেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
এর কয়েক দিন পর ১৪ আগস্ট রাতে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ আয়োজিত একটি কর্মীসভায় শামীম ওসমানের উপস্থিতির খবর প্রকাশিত হয়। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তার অংশগ্রহণ হিসেবে বিষয়টি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে।
এ সময় তার বক্তব্যের বিভিন্ন অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। নিউইয়র্কে আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের একটি সমাবেশে তিনি প্রবাসের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ফলে প্রশ্ন উঠছে এটি কি কেবল প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, নাকি দীর্ঘদিন পর শামীম ওসমানের রাজনৈতিকভাবে ফের সক্রিয় হওয়ার ইঙ্গিত?
শামীম ওসমানের প্রকাশ্য উপস্থিতির পর পরিস্থিতি আরও আলোচনায় আসে ১৫ আগস্ট রাতে। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের চার্চ-ম্যাকডোনাল্ড এলাকায় আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের একটি কর্মসূচিতে তার উপস্থিতির খবর ছড়িয়ে পড়লে বিএনপি, স্বেচ্ছাসেবক দল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা সেখানে বিক্ষোভ করেন । বিক্ষোভের একপর্যায়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং শামীম ওসমানকে সভাস্থল ত্যাগ করতে হয়। কোথাও কোথাও দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সেখানে উপস্থিত হন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এই ঘটনাও নারায়ণগঞ্জে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। কারণ, দেশের বাইরে থেকেও শামীম ওসমানের রাজনৈতিক উপস্থিতি এখন প্রকাশ্য হয়ে উঠছে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে তার সাম্প্রতিক কর্মসূচিগুলোকে ঘিরে।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে শামীম ওসমান দীর্ঘদিন অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি জনসম্মুখের বাইরে চলে যান। পরে বিভিন্ন সময়ে তার অবস্থান নিয়ে নানা আলোচনা হলেও প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তার উপস্থিতি খুব একটা দেখা যায়নি।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে নিউইয়র্কে তার প্রকাশ্য উপস্থিতির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর আগস্টে ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মসূচিতে তার উপস্থিতি সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।
এদিকে তার বিরুদ্ধে আইনি পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শামীম ওসমানসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। পরে মে মাসে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।
ফলে বিদেশে অবস্থানরত অবস্থায় তার প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্য শুধু দলীয় রাজনীতির বিষয় নয়, আইনি ও রাজনৈতিক দুই দিক থেকেই আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।
শামীম ওসমান বিদেশে বসে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং সংগঠনকে সক্রিয় করার চেষ্টা করছেন এমন আলোচনা রাজনৈতিক মহলে চলছে।বিশেষ করে বিদেশ থেকে নারায়ণগঞ্জের মাঠপর্যায়ে অর্থ পাঠিয়ে সংগঠন পুনর্গঠন, নেতাকর্মীদের আর্থিক সহায়তা করে যাচ্ছেন এমন কথাও রাজণীতির মাঠে চলছে।
তবে তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান এবং প্রবাসে আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের কর্মসূচিতে তার অংশগ্রহণ থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে, তিনি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে আবারও প্রকাশ্যে আসছেন।
শামীম ওসমানের প্রকাশ্য তৎপরতা নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগের নিষ্ক্রিয় ও আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। কেউ কেউ এটিকে কর্মীদের মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। আবার বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের অনেকে এটিকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসার প্রস্তুতির ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
তবে নারায়ণগঞ্জের মাঠপর্যায়ে তার এই তৎপরতার সরাসরি সাংগঠনিক প্রভাব পড়েনি । বরং বর্তমানে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের বিভিন্ন কর্মসূচিকে ঘিরে।
শামীম ওসমানের সাম্প্রতিক তৎপরতা আপাতত তিনটি বিষয় সামনে এনেছে প্রথমত, দীর্ঘ নীরবতার পর তার প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্য; দ্বিতীয়ত, প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান; এবং তৃতীয়ত, তার উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতাকর্মীদের প্রকাশ্য প্রতিবাদ।
এখন দেখার বিষয়, নিউইয়র্ককেন্দ্রিক এই রাজনৈতিক তৎপরতা কেবল প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি ভবিষ্যতে নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতিতেও এর কোনো দৃশ্যমান সাংগঠনিক প্রভাব পড়ে।

