নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর রাজনীতিতে নতুন করে দৃশ্যমান হচ্ছে নেতৃত্বের বিভক্তি। বিশেষ করে আসন্ন কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি পাওয়ার প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে একাধিক সংগঠনে পৃথক বলয়ের তৎপরতা বাড়ছে। একই সঙ্গে বর্তমান নেতৃত্বের সাংগঠনিক দুর্বলতা, নিষ্ক্রিয়তা ও সমন্বয়হীনতার অভিযোগও সামনে আসছে। ফলে একই সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে একাধিক বলয়।
দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, এসব বিভক্তি শুধু অভ্যন্তরীণ কোন্দল নয়; বরং আগামী দিনের নেতৃত্বে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার প্রতিযোগিতারও বহিঃপ্রকাশ। এ কারণে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় কর্মসূচিতে কে কত বড় মিছিল বা বেশি নেতাকর্মী নিয়ে অংশ নিতে পারে, তা নিয়েও অঘোষিত প্রতিযোগিতা চলছে।
বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদলের নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখা প্রায় তিন বছর ধরে মাত্র তিন সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে চলছে। দীর্ঘ সময় পার হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি তো দূরের কথা, ঘোষিত আহ্বায়ক কমিটির পরিধিও বাড়েনি। ফলে সংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রম, তৃণমূলের নেতৃত্ব তৈরি এবং পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে হতাশা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের সর্বশেষ কমিটি ঘোষণা করা হয় ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট। ওইদিন কেন্দ্রীয় যুবদলের তৎকালীন সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম মিল্টনের অনুমোদনে তিন সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটিতে সাদেকুর রহমান সাদেককে আহ্বায়ক, খায়রুল ইসলাম সজীবকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এবং মশিউর রহমান রনিকে সদস্য সচিব করা হয়।
এর আগে ২০২২ সালের ১৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের তিন সদস্যের আহ্বায়ক কমিটিতে গোলাম ফারুক খোকনকে আহ্বায়ক, ভিপি কবির হোসেনকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এবং মশিউর রহমান রনিকে সদস্য সচিব করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে গোলাম ফারুক খোকন জেলা বিএনপির দায়িত্বে চলে গেলে নতুন কমিটি গঠনের প্রয়োজন দেখা দেয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের আগস্টে সাদেক-সজীব-রনির নেতৃত্বে বর্তমান কমিটি আসে।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর যুবদলে দীর্ঘদিন ধরে মনিরুল ইসলাম সজল, সাগর প্রধান ও শাহেদ আহমেদের নেতৃত্বাধীন কমিটিই সাংগঠনিকভাবে দৃশ্যমান ছিল। ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট মনিরুল ইসলাম সজলকে আহ্বায়ক, সাগর প্রধানকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এবং শাহেদ আহমেদকে সদস্য সচিব করে তিন সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়।
পরবর্তীতে প্রায় দেড় বছর পর ৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। ফলে ২৯ আগস্ট ২০২৩ থেকে বর্তমান সময় আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত এ নেতৃত্বের প্রায় তিন বছর অতিক্রম হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এ সময়ের মধ্যে ইউনিট কমিটি গঠন নিয়ে দীর্ঘসূত্রতার কথাও উঠে এসেছে।
এ অবস্থায় মহানগর যুবদলের রাজনীতিতে মাজহারুল ইসলাম জোসেফ ও সাগর প্রধানকে ঘিরে নতুন ধরনের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জোসেফ-সাগর প্রধানের নেতৃত্বে পৃথক কর্মসূচির খবরও প্রকাশিত হয়।
ফলে মহানগর যুবদলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। বর্তমান কমিটির বাইরে নতুন বলয় কতটা সাংগঠনিক শক্তি তৈরি করতে পারে, সেটিও এখন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট মাহাবুবুর রহমানকে আহ্বায়ক, সালাউদ্দিন সালুকে সদস্য সচিব এবং রফিকুল ইসলাম রফিককে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। একই বছরের ১৫ অক্টোবর তা ৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটিতে রূপ নেয়।
অর্থাৎ ১৫ অক্টোবর ২০২৩ থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত বর্তমান জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটির বয়স প্রায় ২ বছর ১০ মাস। এর আগে ঘোষিত তিন সদস্যের কমিটি ধরলে নেতৃত্বের মেয়াদ প্রায় তিন বছর।
বর্তমানে মাহাবুবুর রহমানের নেতৃত্বের পাশাপাশি সদস্য সচিব সালাউদ্দিন সালু ও সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম রফিকেরও পৃথক সাংগঠনিক তৎপরতা রয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সালু-রফিককে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলকে সংগঠিত করতে মাঠে সক্রিয় থাকার কথা উল্লেখ করা হয়।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভাতেও মাহাবুবুর রহমান, সালাউদ্দিন সালু ও রফিকুল ইসলাম রফিককে নেতৃত্বে দেখা যায়।
তবে নতুন কমিটি ঘিরে পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ায় সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সমীকরণও বদলাচ্ছে বলে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। কে আহ্বায়ক বা সভাপতি হবেন, আর কে সদস্য সচিব বা সাধারণ সম্পাদক পদে আসবেন—তা নিয়ে একাধিক নেতার নামও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের বর্তমান আহ্বায়ক শাখাওয়াত ইসলাম রানা, সদস্য সচিব মমিনুর রহমান বাবু এবং সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক কামালউদ্দিন জনিকে নিয়ে ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন করা হয় ১৫ অক্টোবর ২০২৩, ফলে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত এ কমিটির বয়সও প্রায় ২ বছর ১০ মাস।
এই কমিটির বাইরে সাবেক ও বর্তমান নেতাদের ঘিরে একাধিক বলয়ের তৎপরতার বিষয়টি এখন সামনে আসছে। বিশেষ করে সাবেক সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান জিয়াকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই পৃথক রাজনৈতিক তৎপরতা রয়েছে। বিভিন্ন কর্মসূচিতে তার সঙ্গে জাকির খান অনুসারী হিসেবে পরিচিত নেতাকর্মীদের উপস্থিতির খবরও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
এদিকে আসন্ন মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটি ঘিরে একাধিক পদপ্রত্যাশীর নাম নিয়ে আলোচনা চলছে। অতীতে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে শাখাওয়াত ইসলাম রানা, জিয়াউর রহমান জিয়া, অহিদুজ্জামান ছক্কু, মমিনুর রহমান বাবুসহ কয়েকজন নেতার নাম নেতৃত্বের আলোচনায় উঠে এসেছে।
অঙ্গসংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভক্তির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ ঘটছে দলীয় কর্মসূচিতে। কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে নিজেদের অনুসারীদের বড় বহর নিয়ে উপস্থিত হওয়া, পৃথক ব্যানারে কর্মসূচি পালন এবং নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রদর্শনের প্রবণতা বাড়ছে।
এতে একদিকে বর্তমান কমিটির নেতারা নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে নতুন নেতৃত্বের প্রত্যাশীরা মাঠে নিজেদের শক্তি দেখিয়ে কেন্দ্রের নজরে আসার চেষ্টা করছেন।
দলীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করছে, কমিটির মেয়াদ দীর্ঘ হওয়া এবং নতুন নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় এ ধরনের প্রতিযোগিতা আরও বাড়ছে। অন্য অংশের মতে, তৃণমূলকে সক্রিয় রাখার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ইতিবাচক হলেও তা যদি ব্যক্তিকেন্দ্রিক বলয়ে পরিণত হয়, তাহলে সাংগঠনিক ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নারায়ণগঞ্জের জেলা ও মহানগর পর্যায়ের যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের বর্তমান কমিটিগুলোর বয়স প্রায় তিন বছরের কাছাকাছি। ফলে নতুন কমিটি নিয়ে পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে তৎপরতা বাড়াটাকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখছেন অনেকে।
তবে এই নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত সাংগঠনিক শক্তি বাড়াবে, নাকি অঙ্গসংগঠনগুলোকে আরও কয়েকটি বলয়ে বিভক্ত করবে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নতুন কমিটি গঠনের সময় মাঠের সক্রিয়তা, তৃণমূলের গ্রহণযোগ্যতা ও সাংগঠনিক সক্ষমতাকে কতটা গুরুত্ব দেয়, তার ওপরই নারায়ণগঞ্জের অঙ্গসংগঠনগুলোর আগামী দিনের নেতৃত্বের সমীকরণ অনেকটাই নির্ভর করছে।

