শেখ সিফাত আতঙ্কের এক নাম। নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকায় তিনি ও তাঁর সহযোগীদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন এক ত্রাসের রাজত্ব। সাধারণ মানুষ তাঁর বাহিনীর ভয়ে মুখ খুলতে ভয় পেতেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, ছিনতাই ও মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধে জড়িত ছিল এই বাহিনীর সদস্যরা।
গত বুধবার (২০ আগস্ট) রাত আনুমানিক ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে বন্দরের সালেহনগর এলাকায় তাহের আলী প্রধানের বাড়ির সামনে পাকা সড়কে বুলবুলের পথরোধ করে একদল দুর্বৃত্ত। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ সিফাতের নেতৃত্বে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত দুর্বৃত্তরা বুলবুলকে ধারালো অস্ত্র, লোহার পাইপ, রামদা, চাপাতি, সুইচগিয়ার ও চাকু দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপায়।
গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা বুলবুলকে উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় ২১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে বন্দর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শেখ সিফাতের বিরুদ্ধে ১৪টি মামলা রয়েছে এবং এর মধ্যে ৬টি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বন্দর এলাকায় বুলবুল নামের এক ব্যক্তিকে সিফাত বাহিনী কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। সিফাত ও তাঁর সহযোগী জুম্মন ওরফে ‘হোয়াইট জুম্মন’ মিলে এলাকায় একটি বাহিনী গড়ে তুলে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছিল। তারা বিভিন্ন সময় অপরাধ করে এলাকা থেকে পালিয়ে যেত।
পুলিশ সুপার জানান, বুলবুল হত্যাকাণ্ডের পর রাতভর অভিযান চালিয়ে ঘটনার প্রায় ছয় ঘণ্টার মধ্যে রাত ৩টার দিকে শেখ সিফাত, তাঁর সহযোগী জুম্মন ওরফে ‘হোয়াইট জুম্মন’সহ মোট ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, সিফাত বাহিনীর অধিকাংশ সদস্যকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সিফাতকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে বন্দর এলাকায় একটি বড় বাহিনীর পতন হয়েছে বলে পুলিশ মনে করছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরবে এবং তাঁরা শান্তিতে বসবাস করতে পারবেন।
অভিযানে গ্রেপ্তার ১১ জনের কাছ থেকে আলামত হিসেবে চাকু, ছুরিসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া তাদের সঙ্গে থাকা একটি ওয়াকিটকিও উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বুলবুল হত্যার কারণ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন, মামলাটি তদন্ত করে হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ খুঁজে বের করা হবে। তিনি জানান, সিফাতকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালালেও অপরাধ করে ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত সরে যাওয়ায় তাকে আগে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে গত এক মাস ধরে সিফাত পুলিশের নজরদারিতে ছিল এবং অবশেষে তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ।
শেখ সিফাত ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তারের পর বন্দর এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। দীর্ঘদিনের আতঙ্ক কাটিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে এখন অনেকটাই শান্তির পরিবেশ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সিফাতকে গ্রেপ্তারের পর অপরাধীদের দৌরাত্ম্য কমবে এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
এলাকাবাসীদের সাথে আলাপ করলে তারাবলেন, “সিফাত ও তার সহযোগীদের ভয়ে দীর্ঘদিন ধরে আমরা আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম। প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করলেও অনেকে ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারেননি। বুলবুলকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা অত্যন্ত ভয়াবহ। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার চাই।”
আরেক বাসিন্দা বলেন, “এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারত না। সন্ধ্যার পর অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হতে ভয় পেতেন। সিফাত ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তারের খবর শুনে এলাকাবাসীর মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।”
স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা চাই বন্দর এলাকায় আর কোনো সন্ত্রাসী বাহিনী মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। শুধু গ্রেপ্তার করলেই হবে না, তদন্ত করে যারা এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত এবং যারা তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।”
আরেক এলাকাবাসী বলেন, “বুলবুলকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় আমরা আতঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ। এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি, দ্রুত তদন্ত শেষ করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।”
স্থানীয় এক বাসিন্দার ভাষ্য,“আমরা এমন একটি বন্দর চাই, যেখানে মানুষ ভয় ছাড়া চলাফেরা করতে পারবে। মাদক, ছিনতাই ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। কোনো অপরাধী যেন রাজনৈতিক বা অন্য কোনো পরিচয়ের আড়ালে ছাড় না পায়।”

