দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন এবং নির্বাচন-পরবর্তী নতুন বাস্তবতায় নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতার অভিযোগ জোরালো হচ্ছে। তৃণমূল নেতাকর্মীদের দাবি, শীর্ষ নেতাদের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ব্যস্ততা, পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে দীর্ঘসূত্রতা, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং অঙ্গসংগঠনগুলোর সমন্বয়ের অভাবে একসময়কার সক্রিয় এই সংগঠনটি এখন অনেকটাই গতি হারিয়েছে।
একসময় আন্দোলন-সংগ্রাম, গণসংযোগ এবং ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে জেলার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম বর্তমানে অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বলছেন, বড় ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচির অভাবে সংগঠনের ভেতরে আগের মতো প্রাণচাঞ্চল্য নেই। এর প্রভাব পড়ছে মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নির্বাচনী প্রস্তুতি, সম্ভাব্য প্রার্থী নির্ধারণ এবং জাতীয় রাজনৈতিক সমীকরণ সামাল দেওয়ার ব্যস্ততায় স্থানীয় পর্যায়ের সাংগঠনিক কার্যক্রম কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। ফলে তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্বের ঘাটতি এবং সমন্বয়ের অভাব আরও দৃশ্যমান হচ্ছে।
দলীয় সূত্র জানায়, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ জেলা পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করায় সাংগঠনিক কাজে আগের মতো সময় দিতে পারছেন না। একইভাবে জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সংসদীয় ও রাজনৈতিক ব্যস্ততা বেড়েছে, জেলা বিএনপির যুগ্ন আহ্বায়ক মাসুকুল ইসলাম রাজিব নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনইউডিএ) চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকে ব্যাস্ত সময় পাড় করছেন। অন্যদিকে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করায় মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমেও তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা কমে এসেছে বলে দলের একটি অংশের নেতাকর্মীদের দাবি।
এসব কারণে জেলা ও মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মেয়াদোত্তীর্ণ ইউনিট কমিটি পুনর্গঠন, পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় তৃণমূল পর্যায়ে অসন্তোষ বাড়ছে।
নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন মাঠে সক্রিয় ও পরীক্ষিত কর্মীদের মূল্যায়নের পরিবর্তে কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তি-প্রভাব ও বলয়ভিত্তিক রাজনীতি গুরুত্ব পাচ্ছে। এতে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতার মধ্যে প্রতিযোগিতা ও বিরোধ তৈরি হচ্ছে, যা সাংগঠনিক শৃঙ্খলার জন্যও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে কাউন্সিল ও সম্মেলনের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের কথা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে জেলা ও মহানগর বিএনপিতে সেই প্রক্রিয়া কার্যকর হয়নি। একের পর এক আহ্বায়ক কমিটি এবং পুনর্গঠনের ধারাবাহিকতা সংগঠনের ভেতরে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ, নেতৃত্বের টানাপোড়েন এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ধীরগতি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জে বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি থাকলেও সেই অবস্থান ধরে রাখতে হলে তৃণমূলকে দ্রুত সক্রিয় করতে হবে। ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ে কার্যকর কমিটি গঠন এবং নিয়মিত সাংগঠনিক কার্যক্রম ছাড়া বড় রাজনৈতিক কর্মসূচিকে সফল করা কঠিন হবে।
যদিও ঈদুল আজহার পর সংগঠনকে পুনর্গঠনের বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো বড় সাংগঠনিক কর্মসূচি দেখা যায়নি। তবে দলীয় নেতারা জানিয়েছেন, তৃণমূলকে মূল্যায়ন, পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসন এবং নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে সংগঠনকে আবারও সক্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত জেলা ও মহানগর বিএনপির গ্রহণযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে। তাদের বিশ্বাস, পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন এবং সাংগঠনিক ঐক্য নিশ্চিত করা গেলে নারায়ণগঞ্জে বিএনপি আবারও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরতে পারবে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই মুহূর্তে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভ্যন্তরীণ বিভক্তি দূর করে একটি কার্যকর ও ঐক্যবদ্ধ সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্য অর্জন করা গেলে জেলার রাজনীতিতে দলটি নতুন করে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

