নারায়ণগঞ্জকে দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। দলটির জন্মসূত্রের ইতিহাসের সঙ্গেও জেলার নাম জড়িয়ে আছে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই নারায়ণগঞ্জেই আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। একসময় রাজপথ দাপিয়ে বেড়ানো নেতা-কর্মীদের বড় একটি অংশ এখন আত্মগোপনে, কেউ কারাগারে, কেউ বা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। ফলে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বশূন্য ও সাংগঠনিক সংকটে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিগত প্রায় দেড় দশকের বেশি সময় ধরে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী নেতাদের একচ্ছত্র প্রভাব ছিল। স্থানীয় রাজনীতি, প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তাদের আধিপত্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা-সমালোচনা ছিল। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ, ওই সময়ে দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে অনেকেই ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এবং নিজেদের অনুসারীদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এর ফলে অনেক ত্যাগী ও যোগ্য নেতাকর্মী দলীয় মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির কেন্দ্রীয় সভাপতি শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন। এরপর থেকেই নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের অধিকাংশ শীর্ষ নেতা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে যান। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হওয়ায় তারা আত্মগোপনে চলে যান, আবার কেউ কেউ বিদেশে অবস্থান করছেন ।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রীয়ভাবে কর্মসূচি ঘোষণার খবর এলেও নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের ব্যানারে উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মসূচি কিংবা রাজপথে উপস্থিতি দেখা যায়নি। মাঝেমধ্যে পোস্টার বা ব্যানারের মাধ্যমে কিছু নেতাকর্মী সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করলেও তা স্থায়ী রূপ পায়নি। ফলে দীর্ঘ সময় ধরেই রাজপথে আওয়ামী লীগের দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই।
একসময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকী ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জে ব্যাপক কর্মসূচি আয়োজন করত আওয়ামী লীগ। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর থেকে সেই চিত্র বদলে গেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটিও দলটির বর্তমান সাংগঠনিক দুর্বলতার একটি প্রতিফলন।
দলটির একাধিক প্রভাবশালী নেতা বর্তমানে প্রকাশ্যে নেই। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, অনেক নেতা মামলা ও গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে রয়েছেন। কেউ কেউ দেশের বাইরে চলে যেতে সক্ষম হলেও তৃণমূলের অধিকাংশ নেতাকর্মী দেশে থেকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। পরিবার-পরিজনের সঙ্গেও অনেকের স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে আলোচনা রয়েছে।
বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্যদের মধ্যে রূপগঞ্জ আসনের সাবেক এমপি গোলাম দস্তগীর গাজী কারাগারে রয়েছেন। একইভাবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীও গ্রেপ্তারের পর কারাগারে থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে নিশ্চুপ হয়ে আছেন। অন্যদিকে প্রভাবশালী সাবেক এমপি শামীম ওসমান, নজরুল ইসলাম বাবু, সহ আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতার অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা থাকলেও তারা প্রকাশ্যে নেই। তাদের বিভন্ন সময় বিভিন্ন দেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যায়।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত মো. বাদল (ভিপি বাদল), মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহাসহ শীর্ষ নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অনুপস্থিত। ফলে সাংগঠনিকভাবে দল পরিচালনার মতো কার্যকর নেতৃত্বের অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের অভিমত।
এদিকে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলো নিয়মিত কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথে সক্রিয় থাকলেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন। ফলে সংগঠন পুনর্গঠন কিংবা মাঠের রাজনীতিতে ফেরার মতো পরিবেশ তৈরি করতে পারছে না দলটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও নেতৃত্বের সংকট কাটিয়ে ওঠা। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর আকস্মিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধাক্কা সামলে দলটি কতটা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতাদের দাবি, দলটি এখনও দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠীর সমর্থন ধরে রেখেছে। তাদের ভাষ্য, সাংগঠনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে দলকে আবারও শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হবে। তবে বাস্তবে সেই উদ্যোগের নেতৃত্ব কে দেবেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ফলে আওয়ামী লীগের জন্মভূমি হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জেই দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

