নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম মাসদাইর এলাকায় ২২ বছর বয়সী যুবক জিসানের মৃত্যুকে ঘিরে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ঘটনার আগে দেওয়া একটি বক্তব্যের ভিডিও। ‘ছিনতাইকারী’ সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত হওয়ার অভিযোগের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সংগঠক ও মসজিদের ইমাম কাওছার আহমেদকে জনতাকে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানাতে দেখা যায়। ভিডিওটি প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
ভিডিওতে কাওছার আহমেদকে বলতে শোনা যায়, “যার কাছে যা আছে তা নিয়ে নেমে যেতে হবে। ঐক্য থাকলে বাংলাদেশের প্রশাসন কি, কোনো কুত্তায়ও আমাদের কিছু করতে পারবো না। পাবলিক যদি কোনো কুত্তারে মেরে ফেলে তাহলে কি অন্যায় হবে? ইনশাল্লাহ কোনো মামলা-হামলা কিচ্ছু হবে না। এভাবে সবাই এক থাকবেন।”
এ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পক্ষে এমন বক্তব্য কতটা গ্রহণযোগ্য।
ঘটনাটি ঘটে শনিবার রাতে পশ্চিম মাসদাইর এলাকায়। নিহত জিসান ওই এলাকার ইউনুছ ওরফে ইনু মিয়ার ছেলে।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের অভিযোগ তুলে স্থানীয় কয়েকজন জিসানকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায়। পরে তার হাত-পা বেঁধে বেধড়ক মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে পরিবারের কাছে রেখে গেলে স্বজনরা দ্রুত খানপুর ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরিবারের দাবি, এটি কোনো তাৎক্ষণিক গণধোলাইয়ের ঘটনা নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে নির্যাতনের মাধ্যমে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে কাওছার আহমেদ বলেন, জিসানের বিরুদ্ধে আগে থেকেই মাদক সেবন, মাদক বিক্রি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ ছিল। সর্বশেষ একটি ছিনতাইয়ের অভিযোগ ওঠার পর ক্ষুব্ধ জনতা তাকে মারধর করে। তার ভাষ্য, এটি জনতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া ছিল।
তবে ঘটনার পর ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জিসানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার স্বজন ও বন্ধুরা লাঠিসোঁটা নিয়ে এলাকায় বিক্ষোভ ও ভাঙচুর চালিয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
ফতুল্লা মডেল থানার ওসি মাহবুব আলম জানান, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, কেউ অপরাধে অভিযুক্ত হলেও তাকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার জনতার নেই। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই।
আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় চোর, ছিনতাইকারী বা মাদক ব্যবসায়ী সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। তাদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও শাস্তি নিশ্চিত করার একমাত্র বৈধ কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্র ও আদালত। এ ধরনের ঘটনার সুষ্ঠু ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত না হলে গণপিটুনির প্রবণতা আরও বাড়তে পারে, যা আইনের শাসনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

