সেই পুরনো রুপ শহরের ফুটপাতে, রাস্তা দখল করে বসে আছে দোকান নিয়ে দেখার কেউ নেই।নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত দখল, হকার পুনর্বাসন ও উচ্ছেদ ইস্যু দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিরোধ, প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ এবং জনদুর্ভোগের অন্যতম কারণ হয়ে রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ফুটপাত উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান এবং সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী-এর সমর্থকদের মধ্যে একাধিকবার উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ক্ষমতার পালাবদলের পরও দীর্ঘ সময় এ সমস্যা অমীমাংসিত থাকলেও বর্তমানে বিএনপি ও সিটি করপোরেশন প্রশাসনের উদ্যোগে নতুন করে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলেও সেটাও আলোর মুখ দেখেনি।
নারায়ণগঞ্জ শহরের বঙ্গবন্ধু সড়ক ও আশপাশের ফুটপাত দখলমুক্ত করতে মেয়র আইভী বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেন। তবে হকারদের একটি অংশ স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমানের সমর্থন পেতেন বলে অভিযোগ ছিল। ২০১৬ সালে ফুটপাত উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। সে সময় আইভীর নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও পরে হকাররা পুনরায় ফুটপাতে বসেন, যা নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ে।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি চাষাঢ়া এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করার দাবিতে মেয়র আইভীর নেতৃত্বে একটি মিছিলের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় আইভীসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। হামলার জন্য তিনি শামীম ওসমানের অনুসারীদের দায়ী করেন। স্থানীয় প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শীরাও ঘটনাটিকে ফুটপাত উচ্ছেদ বিরোধকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘাত হিসেবে উল্লেখ করেন।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে দীর্ঘদিনের বিরোধ ভুলে হকার সমস্যা ও যানজট নিরসনে শামীম ওসমান এবং আইভী এক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন। সেখানে ফুটপাত দখলমুক্ত ও যানজট নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগের বিষয়ে একমত হওয়ার কথা জানানো হয়। তবে বাস্তবে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত দখলমুক্ত করার বিষয়ে কার্যকর কোনো বড় উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে নগরবাসীর অভিযোগ ছিল। এ সময়ও বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত দখল, অবৈধ স্ট্যান্ড এবং হকারদের উপস্থিতি অব্যাহত থাকে।
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়ের পর সরকার গঠন করার পর নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু ফুটপাত দখলমুক্ত করার বিষয়ে সরব হন। ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় চাষাঢ়া এলাকায় ফুটপাতের অবৈধ দোকান ও স্ট্যান্ড উচ্ছেদে অংশ নেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দায়িত্ব গ্রহণের পর ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে কঠোর অবস্থান নেন। তার নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে দীর্ঘদিনের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এরপর ২০২৬ সালের ১৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে। নগরীর বঙ্গবন্ধু সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ফুটপাত থেকে অবৈধ হকার ও স্থাপনা সরিয়ে দেওয়া হয়। এ অভিযানে প্রশাসন, রাজনৈতিক প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
ফুটপাত উচ্ছেদ নিয়ে নারায়ণগঞ্জে দুই ধরনের মতামত রয়েছে। একদিকে ব্যবসায়ী, পথচারী ও নাগরিক সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে দখলমুক্ত ফুটপাতের দাবি জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে হাজারো হকারের জীবিকা ও পুনর্বাসনের প্রশ্নও সামনে এসেছে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, পুনর্বাসন ছাড়া শুধু উচ্ছেদ অভিযান স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি।
নারায়ণগঞ্জের ফুটপাত ইস্যু শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাব, নগর ব্যবস্থাপনা এবং জীবিকার সঙ্গে জড়িত একটি জটিল বাস্তবতা। আওয়ামী লীগ আমলে শামীম ওসমান ও আইভীর বিরোধের কারণে ফুটপাত প্রশ্নটি রাজনৈতিক সংঘাতের রূপ নিয়েছিল। বর্তমানে বিএনপির নেতাদের উদ্যোগ এবং সিটি করপোরেশন প্রশাসনের সক্রিয়তায় নতুন করে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলেও তার সফলতার মুখ দেখা নিয়ে নগর বাসীর প্রশ্ন রয়ে গেছে। টানা কয়েকদিন হকার উচ্ছেদ পরিচালনা করলেও বর্তমানে পুরনো রুপে ফিরেছে ফুটপাত। ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীর।

