ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ নারায়ণগঞ্জে দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে অপরাধ পরিস্থিতি। হত্যা, মাদক,ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। শুধু সাধারণ মানুষই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে র্যাব ও পুলিশের ওপরও একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটছে। এতে করে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।বিশেষ করে গত দেড় মাসে জেলায় অন্তত ২২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে র্যাব ও পুলিশের ওপর চারটি পৃথক হামলার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। অপরাধীরা শুধু সাধারণ মানুষ নয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে।
সবশেষ গত বৃহস্পতিবার (১৪ মে) ফতুল্লার চাঁদমারী মাউড়াপট্টি এলাকায় “ফ্রেন্ডস ক্যাবল” অফিসে ঢুকে নাছির (৬০) নামের এক ডিশ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। দুপুর একটার দিকে সংঘটিত এ ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিহতের স্ত্রী অভিযোগ করেন, তার স্বামীর ব্যবসায়িক অংশীদার বাবু এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। স্থানীয় সিসিটিভি ফুটেজে দুই যুবককে ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে পালিয়ে যেতে দেখা গেছে। পরে পাশের একটি বাড়ি থেকে রক্তমাখা ছুরি উদ্ধার করে পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শী অটোরিকশা চালক আলাউদ্দিন জানান, রক্তমাখা ছুরি হাতে কালো পাঞ্জাবি পরা এক যুবককে দ্রুত পালিয়ে যেতে দেখেছেন তিনি।
শহরের বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় একাধিক মাদকের হাঁট বসিয়ে ব্যবসা করছে মাদক ব্যবসায়িরা। বিশলা বাহীনি দিয়ে নিয়ন্ত্র করছে গোটা এলাকা। সিসি ক্যামেরা বসিয়ে নিজের রক্ষা করছে তারা, গত শুক্রবার দুপুরে শহরের গলাচিপা এলাকার চেয়ারম্যান বাড়িতে হামলা চালায় র্শীষ মাদক ব্যবসায়ি বুইট্টা মাসুদ বাহিনী।
এর আগে ১ মে বন্দরের পুরান বন্দর চৌধুরীবাড়ি এলাকায় ছিনতাই তদন্তে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে একটি শটগান ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। চার ঘণ্টা পর পরিত্যক্ত অবস্থায় অস্ত্রটি উদ্ধার করা হলেও এ ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্য আহত হন।
পরদিন ২ মে ইসদাইর থেকে অপহরণের পর নিহত যুবক শুভর মামলার বাদী ও তার মা মাকসুদা বেগম রহস্যজনক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। ওই মামলার অন্যতম আসামি হিসেবে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা সাখাওয়াত হোসেন রানার নাম রয়েছে। ৪ মে চনপাড়া এলাকায় পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া যুবদল নেতা শামীমকে পুলিশের গাড়ি থেকে ছিনিয়ে নেয় তার অনুসারীরা। হামলার সময় পুলিশের অস্ত্রও নিয়ে পালিয়ে যায় তারা।
৫ মে শহরের বোয়ালিয়া খাল লিচুবাগ এলাকায় ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ধরতে গিয়ে র্যাব সদস্যরা হামলার শিকার হন। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তিন সদস্য গুরুতর আহত হন। ৬ মে একদিনেই জেলার বিভিন্ন এলাকায় একাধিক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। নিতাইগঞ্জ কেরোসিন ঘাট এলাকা থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সিদ্ধিরগঞ্জে তালাবদ্ধ ঘর থেকে বর্ষা নামে এক গার্মেন্ট কর্মীর মরদেহ উদ্ধার হয়। ফতুল্লায় অবসরপ্রাপ্ত এক পুলিশ সদস্যের বাড়িতে হামলা চালিয়ে আসবাবপত্র লুটের চেষ্টা করে আজাদ বাহিনী। পরে গ্রেপ্তারকৃতদের ছিনিয়ে নিতে পুলিশের ওপর হামলা চালানো হয়। একইদিন সোনারগাঁয়ে সৌদি প্রবাসীর বাড়িতে দুঃসাহসিক চুরির ঘটনায় প্রায় ২২ লাখ টাকার স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকা লুট করা হয়।
৮ মে সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল এলাকায় চাঁদার দাবিতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। এতে অন্তত চারজন আহত হন। ১০ মে ফতুল্লায় অপহরণ, চাঁদাবাজি ও নির্মাণাধীন ভবনে হামলার অভিযোগ ওঠে কয়েকজনের বিরুদ্ধ১২ মে ফতুল্লার একটি গার্মেন্ট কারখানার স্টোর রুম থেকে এজিএম ইদ্রিস আলীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
১৩ মে সিদ্ধিরগঞ্জে জমি বিরোধকে কেন্দ্র করে মসজিদের দেয়াল ভাঙচুর ও ক্যাশবক্স লুটের ঘটনা ঘটে। একইদিন সোনারগাঁয়ের মুক্তিশপুর এলাকায় ডাকাতদের হামলায় নজরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। ডাকাতরা তার ঘর থেকে নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কারসহ প্রায় ১২ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।
১৪ মে রাত দুইটার দিকে আড়াইহাজার পৌরসভার মুকুন্দি এলাকায় শাহ আলমের বাড়িতে ডাকাতি হয়। অস্ত্রের মুখে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার লুটে নেয় ৯ থেকে ১০ জনের মুখোশধারী দল। এ সময় বাড়ির মালিক ও তার ভাইকে কুপিয়ে আহত করা হয়।
এদিকে এপ্রিল মাসজুড়েও জেলার বিভিন্ন এলাকায় হত্যা, সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে মৃত্যু, রহস্যজনক লাশ উদ্ধার ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুসহ অন্তত ১৯টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে সোনারগাঁয়ে কুপিয়ে হত্যা, ফতুল্লায় শিশুর মরদেহ উদ্ধার, সিদ্ধিরগঞ্জে রহস্যজনক মৃত্যু, রূপগঞ্জে মারধরে অটোরিকশা চালক নিহত, পানিতে ডুবে শিশুদের মৃত্যু, বিষাক্ত গ্যাসে দুই নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু এবং শীতলক্ষ্যা নদী থেকে একাধিক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার ও সোনারগাঁ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নিয়মিত সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটলেও অধিকাংশ ঘটনার শেষ পর্যন্ত কোনো কার্যকর সুরাহা হয় না। ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, একের পর এক ভয়াবহ ঘটনার পরও কেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে নারায়ণগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।

