দীর্ঘদিন পর জাতীয় রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় নারায়ণগঞ্জে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে দলটির জেলা, মহানগর এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। দলীয় নেতাকর্মীদের ভাষায়, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াইয়ের চেয়ে নিজেদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার, অবস্থান শক্ত করা এবং নেতৃত্বের প্রতিযোগিতাই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ফলে অনেকেই বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘দাবার চালের রাজনীতি’ বলে আখ্যায়িত করছেন।
দলীয় একাধিক সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যে চারটিতে বিএনপির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও সেই রাজনৈতিক শক্তিকে সাংগঠনিক সক্ষমতায় রূপ দিতে পারেনি দল। বরং জেলা ও মহানগর বিএনপির ভেতরে বিভিন্ন বলয়ে বিভক্তি, সমন্বয়হীনতা এবং নেতৃত্বের টানাপোড়েন দিন দিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
নির্বাচনের পর জেলা বিএনপিকে আরও সক্রিয় করার লক্ষ্যে সিদ্ধিরগঞ্জে জেলা কার্যালয় চালু করা হয়। সেখানে জেলা বিএনপির ব্যানারের পাশাপাশি জেলার গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ছবি সংযুক্ত করা হয়েছিল। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই সেই কার্যালয়ের সাইনবোর্ড অপসারণ এবং নতুন ব্যানার স্থাপনকে কেন্দ্র করে দলীয় অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়।
ঘটনাটি নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ থাকলেও জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে প্রকাশ্য কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। পরে সমালোচনার মুখে আগের ব্যানার পুনঃস্থাপন করা হলেও ঘটনাটি জেলা বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতার প্রতীক হিসেবে আলোচিত হয়।
এর কিছুদিন পর নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে এবং জেলা যুবদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীবকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয়। একই দিন কেন্দ্রীয় যুবদল তাকে সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করে। যদিও পরে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়, তবে ঘটনাটি জেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করে।
মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব শাহেদ আহমেদ সিদ্ধিরগঞ্জে এক ব্যবসায়িকে গালাগালি হুমকির অডিও ভাইরালের ঘটনায় নারায়ণগঞ্জে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় যুবদল শাহেদ কে শোকজ করে ২৪ ঘন্টার মধ্যে জবাব দিতে বলেছে।
বর্তমানে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মামুন মাহমুদ জেলা পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন। সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু সংসদ সদস্য হিসেবে ব্যস্ত। যুগ্ম আহ্বায়ক মাশুকুল ইসলাম রাজীব নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন। অন্যদিকে শরীফ আহমেদ টুটুল ব্যক্তিগত ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রমে নিয়মিত সময় দিতে পারছেন না বলে দলীয় সূত্রের দাবি। এছাড়া কমিটির অন্যতম সদস্য মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বহিষ্কার অবস্থায় থাকায় নেতৃত্বের ভারসাম্য আরও দুর্বল হয়েছে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা।
শুধু জেলা নয়, মহানগর বিএনপিতেও নেতৃত্বের মধ্যে দূরত্ব এখন প্রকাশ্য। আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এবং সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপুকে বিভিন্ন কর্মসূচিতে আলাদাভাবে দেখা যাচ্ছে।
দলীয় সূত্রের দাবি, যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কাউসার আশা সংসদ সদস্য আবুল কালামের ছেলে হওয়ায় তিনি মূলত বন্দর এলাকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকছেন। ফলে মহানগর বিএনপির সমন্বিত সাংগঠনিক কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না।
এছাড়া মহানগর বিএনপির একাধিক নেতা নিজ নিজ বলয় নিয়ে সক্রিয় থাকলেও দলীয় ব্যানারে সবাইকে একসঙ্গে দেখা যায় না। এতে করে সাংগঠনিক ঐক্যের পরিবর্তে বিভক্তির চিত্রই বেশি স্পষ্ট হচ্ছে।
জেলা ও মহানগর যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনেও নতুন নেতৃত্ব গঠন দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ের অনেক কমিটি এখনো পুনর্গঠন হয়নি।
নেতাকর্মীদের অভিযোগ, নতুন নেতৃত্ব আসার পথ রুদ্ধ করে বর্তমান নেতৃত্ব নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে। এতে তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়ছে।
দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকট হলো চেইন অব কমান্ডের দুর্বলতা। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনেক সময় মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতারাও নিজেদের অবস্থানকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
ফলে একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান দেখা যাচ্ছে এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা প্রশ্নের মুখে পড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে দলের সাংগঠনিক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নিয়মিত সম্মেলনের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের কথা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে জেলা ও মহানগর বিএনপিতে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন হয়নি। এতে নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা যেমন বেড়েছে, তেমনি তৃণমূলেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
তৃণমূল নেতাদের দাবি, দ্রুত সম্মেলনের মাধ্যমে নির্বাচিত ও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হলে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ফিরবে এবং দলীয় কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিরসন করে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করারও আহ্বান জানানো হচ্ছে।
গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় নারায়ণগঞ্জে বিএনপি তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ সাংগঠনিকভাবে কাজে লাগানোর পরিবর্তে দলটির ভেতরেই প্রভাব বিস্তার, অবস্থান সুসংহত করা এবং নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিরোধী শক্তির অনুপস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা আরও দৃশ্যমান হয়েছে। এর ফলে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার পরিবর্তে একই দলের নেতাকর্মীরাই একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছেন।
এ অবস্থায় নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নেতৃত্বের সমন্বয় বৃদ্ধি এবং তৃণমূলকে সক্রিয় করে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা। অন্যথায় রাজনৈতিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও সাংগঠনিক দুর্বলতা ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

