ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে ঘিরে আবারও সরগরম হয়ে উঠেছে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গন। সাম্প্রতিক সময়ে তার জামিন বহাল ও মুক্তির সম্ভাবনা সামনে আসার পর থেকেই নগরজুড়ে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। বিশেষ করে আসন্ন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে আইভীর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ২০০২ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন। ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ছিলেন। ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর নারয়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি মেয়র হিসেবে জয়লাভ করেন। ২৭ নভেম্বর তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী সিটি কর্পোরেশন মেয়র হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং ১ ডিসেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর দ্বিতীয় নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত হন। ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি মেয়র হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে শপথ গ্রহণ করেন। ১৬ জানুয়ারি ২০২২ নির্বাচনে তৃতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হন। ২০২২ সালের ২২ আগষ্টের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সেলিনা হায়াৎ আইভী প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা ভোগ করবেন। সেই অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক দক্ষতা তাকে এখনো নির্বাচনী সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছে। টানা সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে তিনি গড়ে তুলেছেন একটি শক্তিশালী জনভিত্তি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তাকে আলাদা জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইভী যদি সকল মামলায় জামিন পেয়ে মুক্ত হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবেন। কারণ, তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং ভোটব্যাংক এখনো দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে অন্যান্য প্রার্থীরা মাঠে সক্রিয় থাকলেও আইভীর সম্ভাব্য অংশগ্রহণ পুরো নির্বাচনের চিত্র পাল্টে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে উত্তেজনা ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।
স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় পরিচয়ের বাইরে সাধারণ মানুষের মাঝেও তার গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা রয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। নগর উন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা, সড়ক সংস্কার, জলাবদ্ধতা নিরসনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আইভী বরাবরই ব্যতিক্রমী একটি চরিত্র। দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত ইমেজ ও জনসম্পৃক্ততাই তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে। ফলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিলে তা শুধু আওয়ামী লীগের জন্য নয়, বিএনপি ও অন্যান্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। দলটির একাধিক নেতা মনে করছেন, আইভী নির্বাচনে ফিরলে ভোটের মাঠ আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ এখন পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তাকে পরাজিত করতে পারেননি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী। ফলে তার অংশগ্রহণ পুরো নির্বাচনী পরিবেশ ও কৌশলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্র বলছে, বিএনপি ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থী ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিয়ে কাজ শুরু করেছে। তবে আইভীর জনপ্রিয়তা ও ব্যক্তিগত ভোটব্যাংকের বিষয়টি মাথায় রেখেই তাদের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। একইসঙ্গে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
সাধারণ ভোটারদের একাংশের মতে, আইভী মাঠে ফিরলে নির্বাচন আরও প্রাণবন্ত ও প্রতিযোগিতামূলক হবে। নগরবাসীর একটি বড় অংশ এখনও তাকে উন্নয়ন ও সাহসী নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে সমালোচকরাও বলছেন, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার কারণে নতুন নেতৃত্বের সুযোগ সৃষ্টি হওয়াও প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর সম্ভাব্য মুক্তি ও রাজনৈতিক সক্রিয়তা নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচনী মাঠে নামেন কি না এবং তার উপস্থিতি নগর রাজনীতির সমীকরণ কতটা বদলে দেয়।

