বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্সে প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরির ঘটনা ঘটেছে। ব্লকচেইন বিশ্লেষকদের ধারণা, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি হ্যাকার গোষ্ঠী এ হামলার পেছনে থাকতে পারে। ঘটনাটিকে এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ঘটনা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্লকচেইন তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস উচ্চমাত্রার আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হ্যাকার গোষ্ঠী ‘ট্রেডারট্রেইটর’ এ হামলা চালিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ব্লকচেইনের ভেতরে ও বাইরের বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে তারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। হামলার বেশ কিছু বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট আগের সাইবার হামলার মিল রয়েছে।
ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী আরেক প্রতিষ্ঠান চেইনঅ্যানালাইসিসও মনে করছে, এ হামলার পেছনে ট্রেডারট্রেইটর থাকতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা জোনাথন লেভিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘সময় এখন নজিরবিহীন। কিন্তু উত্তর কোরিয়া তাদের পুরোনো কৌশলেই ফিরে গেছে। আগের একটি হ্যাকের সঙ্গে যোগসূত্রের কারণে আমরা মনে করছি, বাইন্যান্সে ৬৪০ কোটি ডলারের হামলাটি উত্তর কোরিয়ার গোষ্ঠী ট্রেডারট্রেইটর চালিয়ে থাকতে পারে।’
ডিপিআরকে বা ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অব কোরিয়া উত্তর কোরিয়ার সরকারি নাম।
বাইন্যান্সের ওয়ালেট থেকে সরানো হলো ৬৩০ কোটি ডলারের সম্পদ
বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্স এ ঘটনাকে ‘জটিল হামলা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের প্রায় ৩০০ কোটি ডলার জব্দ করতে ব্লকচেইন খাতের অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে তারা। একই সঙ্গে ব্যবহারকারীদের হারানো সম্পদ উদ্ধারের চেষ্টাও চলছে।
এক বিবৃতিতে বাইন্যান্স জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীদের সম্পদ পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়েছে। আরও অর্থ শনাক্ত, জব্দ ও উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিভিন্ন সম্পদের ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান, ব্লকচেইন গোয়েন্দা সংস্থা ও শিল্প খাতের অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে প্ল্যাটফর্মটি।
বাইন্যান্স আরও জানিয়েছে, এ ঘটনার ক্ষতি সামাল দিতে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব তহবিল থেকে ৬৩৪ কোটি ডলারের বেশি অর্থ সংরক্ষণ করেছে। এর মধ্যে ৫০০ কোটি ডলারই ক্ষতিগ্রস্ত একই ধরনের টোকেনে রাখা হয়েছে।
টিআরএম ল্যাবসের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর ১০টি ব্লকচেইনে থাকা বাইন্যান্সের বিভিন্ন ওয়ালেট থেকে প্রায় ৬৩৬ কোটি ডলারের সম্পদ সরিয়ে নেয় হামলাকারীরা। এর বেশির ভাগই মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে সরানো হয়। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এটি এখন পর্যন্ত নথিভুক্ত সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি।
উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের পুরোনো কৌশল
উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুর্ধর্ষ হ্যাকার গোষ্ঠী লাজারাস গ্রুপের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয় ট্রেডারট্রেইটরকে। ২০১৪ সালে সনি পিকচার্সে সাইবার হামলার অভিযোগও উঠেছিল এ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকে ব্যঙ্গ করে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘দ্য ইন্টারভিউ’ মুক্তির প্রতিবাদে ওই হামলা চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর এক দশকের বেশি সময় পর, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বাইবিটে বড় ধরনের সাইবার হামলার জন্য ট্রেডারট্রেইটরকে দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই। ওই হামলায় প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরি হয়েছিল।
টিআরএম ল্যাবস বলেছে, বাইন্যান্সে সাম্প্রতিক হামলার সঙ্গে বাইবিটসহ উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট আগের হামলাগুলোর বেশ কিছু বৈশিষ্ট্যের মিল রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, বাইন্যান্সের এই চুরির পরিমাণ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাইবিটে হওয়া ১৫০ কোটি ডলারের চুরির প্রায় চার গুণ।
এদিকে, বাইন্যান্সে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। বিটকয়েনের দাম প্রায় ৪ শতাংশ কমে ৭৭ হাজার ৪৬৫ ডলারে নেমে আসে। বিটকয়েন ও ইথেরিয়ামের দাম যথাক্রমে প্রায় ৫ ও ৬ শতাংশ পড়ে যায়। বাইন্যান্সের নিজস্ব ক্রিপ্টোকারেন্সি বিএনবির দামও প্রায় ১ শতাংশ কমে যায়।

