নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহার শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন বলে খবর পাওয়া গেছে। ব্রেনস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তিনি দেশের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে। তবে তাঁর বর্তমান শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসার স্থান কিংবা চিকিৎসকদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
দীর্ঘদিন নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা এই আইনজীবী ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে প্রকাশ্যে নেই। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ঘটনায় মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে তৎকালীন মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলা এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া একাধিক হত্যা মামলায় তাঁর নাম আসামী তিসি।
খোকন সাহার রাজনৈতিক পথচলা দীর্ঘদিনের। ১৯৮৩ সালে ছাত্রলীগের জাতীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৭ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন ।
১৯৯২ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক নির্বাচিত হন খোকন সাহা। পরে ১৯৯৬ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিন মেয়াদে পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে তাঁকে নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক করা হয়। পাশাপাশি তিনি আইন পেশায় যুক্ত ছিলেন এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দুইবার দায়িত্ব পালন করেন ।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগের পরিচিত নেতাদের একজন হয়ে ওঠেন। নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার বিষয়টিও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। ২০১৮ সালের সাক্ষাৎকারে খোকন সাহা শামীম ওসমানকে বন্ধু হিসেবে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেছিলেন।
খোকন সাহার বিরুদ্ধে বহুল আলোচিত মামলাগুলোর একটি দায়ের করেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। ২০২১ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলাটি করা হয়। মামলায় খোকন সাহার পাশাপাশি প্রদীপ দাস নামে এক ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়। ইউটিউব ও ফেসবুকে প্রচারিত বক্তব্যের মাধ্যমে মেয়রের মানহানি এবং আপত্তিকর মন্তব্য প্রচারের অভিযোগ আনা হয়েছিল।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে জুলাই মাসে শুরু হওয়া আন্দোলন এবং পরবর্তী সহিংসতার ঘটনায় নারায়ণগঞ্জে একাধিক হত্যা মামলা দায়ের হয়।
মিলন হত্যা মামলা: ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট সিদ্ধিরগঞ্জে মাছ ব্যবসায়ী মিলন নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় খোকন সাহার নাম আসে। নিহতের স্ত্রী শাহনাজ বেগম ৬২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। অভিযোগে শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ অন্যদের নাম ছিল। খোকন সাহাও ওই মামলার আসামি হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিলেন।
মনির হোসেন হত্যা মামলা: ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট সিদ্ধিরগঞ্জের হীরাঝিল রোডে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়া মনির হোসেনের ঘটনায় আরেকটি মামলা হয়। নিহতের ছোট ভাই সাখাওয়াত হোসেনের করা মামলায় ১২৩ জনকে আসামি করা হয়। এই মামলাতেও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহার নাম ছিল।
সোলাইমান হত্যা মামলা: সিদ্ধিরগঞ্জে সোলাইমান নামে এক তরুণের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলাতেও খোকন সাহার নাম আসামির তালিকায় রয়েছে । মামলাটির অভিযোগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শিমরাইল এলাকায় আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নারায়ণগঞ্জের অনেক নেতার মতো খোকন সাহাকেও প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে দেখা যায়নি। বিভিন্ন মামলায় নাম আসার পর তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন ।
এদিকে তাঁর শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ার খবর নতুন করে তাঁকে আলোচনায় এনেছে। তবে তিনি কোন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, কখন ব্রেনস্ট্রোক করেছেন এবং তাঁর শারীরিক অবস্থা কতটা গুরুতর এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক চিকিৎসা-তথ্য পাওয়া যায়নি।
খোকন সাহার রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালে ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে আওয়ামী লীগের নগর পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে পৌঁছানোর দীর্ঘ পথচলা দেখা যায়। একই সঙ্গে দলীয় রাজনীতির অভ্যন্তরীণ বিরোধ, মেয়রের করা মামলা, আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং ২০২৪ সালের পর একাধিক হত্যা মামলায় নাম আসার ঘটনাও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগের খবর পাওয়া গেলেও তা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল বা পরিবারের পক্ষ থেকে কোন আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি।

