বর্তমানে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হওয়ায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলগুলো সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত করে মাঠে নামলেও বিএনপিতে এখনো শুরু হয়নি আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন প্রক্রিয়া। তবে দলটির একাধিক নেতা ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে শুরু করেছেন। ফলে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে বিএনপির অভ্যন্তরে নতুন করে দ্বন্দ্ব ও বিদ্রোহের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দলীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে প্রার্থী পরিবর্তনের যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি হোক এমনটি চান না তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তাদের মতে, এবারও যদি শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন বা একাধিক গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠে, তাহলে নির্বাচনী মাঠে বিএনপিকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
জানা গেছে, জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে সরকার ও নির্বাচন কমিশন সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করছে। সম্ভাব্য সময়সূচি অনুযায়ী অক্টোবর-নভেম্বর পর ধাপে ধাপে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনে নির্বাচন হতে পারে। সেই তালিকায় রয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনও।
এদিকে অন্যান্য রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যে তাদের প্রস্তুতি অনেকটাই দৃশ্যমান করেছে। খেলাফত মজলিস নাসিক নির্বাচনে এবিএম সিরাজুল মামুনকে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী তাদের কেন্দ্রীয় আমীর ড. শফিকুর রহমানের উপস্থিতিতে মহানগর আমীর আব্দুর জব্বারকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিলেও মহানগর আহ্বায়ক শওকত আলী কিংবা রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য আলী আহসান জোনায়েদের নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
অন্যদিকে বিএনপির ভেতরে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী নিয়ে আলোচনা আরও বিস্তৃত হচ্ছে। দলীয় সূত্র বলছে, বর্তমান সিটি করপোরেশন প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, ব্যবসায়ী মাসুদুজ্জামান মাসুদ,মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু, মহানগর বিএনপি নেতা জাকরি খান,বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রাকিবুল ইসলাম রাকিব মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকায় রয়েছেন। এছাড়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মামুন মাহমুদ ও যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুকুল ইসলাম রাজীবের নামও আলোচনায় থাকলেও তারা বর্তমানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় তাদের প্রার্থিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
দলীয় নেতাদের একাংশের মতে, চেইন অব কমান্ড দুর্বল হয়ে পড়ায় বিএনপিতে এখন প্রায় সবাই নিজেকে নেতৃত্বের দাবিদার মনে করছেন। ফলে একে অপরকে ছাড় দিতে রাজি নন অনেকেই। এ কারণেই মনোনয়ন ঘোষণার পর বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এমন একজন প্রার্থী নির্বাচন করা, যাকে কেন্দ্র করে দল ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারবে। কারণ ক্ষমতাসীন দল হিসেবে এবার তাদের ওপর প্রত্যাশাও বেশি। ভুল সিদ্ধান্ত হলে তার প্রভাব শুধু নাসিক নির্বাচনেই নয়, দলীয় সাংগঠনিক অবস্থানেও পড়তে পারে।
এদিকে গত বছর গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকার পর সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী জামিনে মুক্ত হয়ে নিজ বাসভবনে অবস্থান করছেন। যদিও বিভিন্ন সূত্র বলছে, তিনি এখনো নির্বাচন নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। তবে তফসিল ঘোষণার পর তার সমর্থকরা তাকে নির্বাচনে আনার চেষ্টা করতে পারেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। ফলে নাসিক নির্বাচন আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ার আভাস মিলছে।
এছাড়া জামায়াত, খেলাফত মজলিস ও এনসিপি ইতোমধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডে সাংগঠনিক প্রস্তুতি ও প্যানেল গঠনের কাজ শুরু করেছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে বিএনপি এখনো প্রার্থী নির্ধারণ করতে না পারায় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহানগর বিএনপির এক নেতা বলেন, “দল যাকে মনোনয়ন দেবে আমরা তার পক্ষেই কাজ করব। তবে কিছু নেতা আছেন, যারা দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিতে চান না। মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হলে তারা ভিন্ন পথে হাঁটার চেষ্টা করতে পারেন। এখন নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ায় দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা অনেক নেতাকেও আবার সক্রিয় হতে দেখা যাচ্ছে।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, ততই নাসিকের মেয়র পদকে ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাবে। তবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে থাকবে বিএনপি—দলটি অভ্যন্তরীণ বিরোধ সামলে ঐক্যবদ্ধভাবে একজন গ্রহণযোগ্য প্রার্থী দিতে পারে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

