নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় আলম মিয়ার বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও ফতুল্লা ডিপিডিসি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সংযোগ বিচ্ছিন্নের মাত্র তিন দিনের মাথায় একই বাড়িতে অবস্থিত ‘শহীদ কম্পিউটার’ নামের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পুনরায় বিদ্যুৎ সংযোগ চালু হওয়ার ঘটনায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, আবাসিক মিটার থেকে সংযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে ৮৪ হাজার টাকার আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নতুন করে বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
এ ঘটনায় আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন ডিপিডিসি ফতুল্লা অঞ্চলের রিডার মো. নাসির। তাঁর দাবি, শহীদ কম্পিউটারের মালিক ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশের বিভিন্ন মামলার কাজ করেন। এ কারণে থানার একাধিক পুলিশ সদস্য তাঁকে ফোন করে নতুন সংযোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। তবে বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের কারণে বিচ্ছিন্ন করা সংযোগ পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো প্রশাসনিক বা আইনগত ক্ষমতা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় আলম মিয়ার বাড়ির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এর তিন দিন পর পাশের বাড়ির রিপন খন্দকারের বাসার মিটার থেকে কথিতভাবে অবৈধ উপায়ে শহীদ কম্পিউটারে বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া হয়। বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে এলে তাঁদের অভিযোগের ভিত্তিতে একই দিন ডিপিডিসি কর্তৃপক্ষ পুনরায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে।
তবে বকেয়া বিল পরিশোধ না করেই নতুন করে সংযোগ চালু করার অভিযোগ উঠেছে শহীদ কম্পিউটারের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, ৮৪ হাজার টাকার আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে ডিপিডিসির কয়েকজন কর্মকর্তা ও মিটার রিডার নাসিরের যোগসাজশে এ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে ডিপিডিসি ফতুল্লা অঞ্চলের রিডার মো. নাসিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ওই দোকানের মালিক ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশের বিভিন্ন মামলার কাজ করেন। এ কারণে থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাঁকে ফোন করে নতুন সংযোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন।
পুলিশের অনুরোধে বিচ্ছিন্ন সংযোগ পুনরায় চালু করার ক্ষেত্রে কোনো প্রশাসনিক বা আইনগত ক্ষমতা রয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি। বরং বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানতে এক্সচেঞ্জ স্যারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
৮৪ হাজার টাকার বিনিময়ে নতুন সংযোগ দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগের বিষয়ে নাসির বলেন, ওই ব্যক্তি তাঁর একটি মিটারের বিল পরিশোধ করেছেন। তাই তিনি টাকা দিয়েছেন। তবে মিটারটি দোকানমালিকের নামে না হলে তিনি কেন সেই বিল পরিশোধ করলেন এবং নতুন সংযোগের জন্য ৮৪ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
অন্যদিকে শহীদ কম্পিউটারের মালিক শহীদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি লাইন নিয়েছি। বিদ্যুৎ অফিসে অনেক সাংবাদিক ক্যামেরা নিয়ে গিয়েছিলেন। আপনারা তাঁদের কাছে জিজ্ঞাসা করুন।’
তিনি আরও দাবি করেন, যেদিন বিদ্যুৎ বিভাগের প্রায় ৪০ জন লোক এসে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন, সেদিন ফতুল্লা মডেল থানার এসআই নন্দনসহ আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের অনুরোধ সত্ত্বেও বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
শহীদুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, পরদিন তিনি রিপন খন্দকারের বাসার মিটার থেকে সংযোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু এক ব্যক্তি বিদ্যুৎ অফিসে ফোন করার পর কর্মকর্তারা এসে সেটিও বিচ্ছিন্ন করে দেন। কে ফোন করেছিলেন, তা তিনি জানেন বলেও দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য, বিদ্যুৎ অফিস থেকেই তাঁকে ফোন করে বিষয়টি জানানো হয়েছিল।
তবে বৈধ সংযোগ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া এবং ভাড়াটিয়া হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে তিনি নতুন সংযোগ পেয়েছেন, জানতে চাইলে শহীদুল ইসলাম বিস্তারিত কোনো বক্তব্য দেননি। তিনি পরে ফোন করার কথা বলে আর কথা বাড়াননি।
এ বিষয়ে ফতুল্লা ডিপিডিসির সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল হাই বলেন, কোনো গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকার কারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর সেখানে বিকল্প বা অন্য কোনো মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান করা অবৈধ ও বেআইনি। তবে একই বাড়িতে শহীদ কম্পিউটারে পুনরায় সংযোগ চালুর অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। এমনকি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলেও জানান।
সব মিলিয়ে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া, আবাসিক মিটার ব্যবহার করে দীর্ঘদিন বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ, সংযোগ বিচ্ছিন্নের পর পুনরায় বিদ্যুৎ সংযোগ চালু এবং ৮৪ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগ—পুরো বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে স্থানীয় সচেতন মহলে।
বিশেষ করে মিটার রিডার নাসিরের বক্তব্যে পুলিশ সদস্যদের ফোন করে সংযোগ দেওয়ার অনুরোধের বিষয়টি সামনে আসায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, সাধারণ গ্রাহকের ক্ষেত্রে বকেয়া বিলের কারণে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলে একই স্থানে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংযোগ পুনরায় চালু হলো কীভাবে? ৮৪ হাজার টাকা পরিশোধের দাবির ভিত্তি কী? আর আবাসিক মিটার ব্যবহার করে সাত বছর ধরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগের দায় নেবে কে?
এসব প্রশ্নের সুষ্ঠু জবাব পেতে ডিপিডিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

