নারায়ণগঞ্জে নবাগত পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অবৈধ অস্ত্র ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের ধারাবাহিক সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে জেলার বিভিন্ন থানা ও মাদকপ্রবণ এলাকায় একের পর এক অভিযান এবং বিপুলসংখ্যক গ্রেপ্তারের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।
গত ৩ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেন ২৪তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান। দায়িত্ব নেওয়ার পরের দিন ৪ সেপ্টেম্বর থেকেই জেলার অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে অভিযান জোরদার করা হয়।
দায়িত্ব নেওয়ার পরদিন ৪ সেপ্টেম্বর রূপগঞ্জের তারাবো বাজার এলাকায় মাদক ব্যবসার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের সংঘর্ষ ও অস্ত্রের মহড়ার ঘটনায় অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় গুলিভর্তি একটি বিদেশি পিস্তলসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান নিজে রূপগঞ্জ থানায় সংবাদ সম্মেলন করে এ অভিযানের তথ্য জানান।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় মাদক ব্যবসার আধিপত্যকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধ চলছিল। ফলে নতুন এসপির দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই অস্ত্র ও মাদককেন্দ্রিক অপরাধের বিরুদ্ধে এই অভিযানকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
এরপর ৪ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলার সাতটি থানায় মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালানো হয়। জেলা পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই অভিযানে ১০৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় ৫৪ জন, সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ জন, বন্দরে ১১ জন, সোনারগাঁয়ে ৮ জন, রূপগঞ্জে ৬ জন এবং আড়াইহাজারে ৫ জন রয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারদের মধ্যে মাদক-সংক্রান্ত মামলার আসামির পাশাপাশি বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরাও রয়েছেন।
পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জে মাদক বিস্তার, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও অবৈধ অস্ত্রের বিষয়ে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। এসব অপরাধ দমনে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
৫ সেপ্টেম্বর রাতে নগরীর অন্যতম আলোচিত এলাকা টানবাজারে পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়। একই সময়ে জেলার সাতটি থানায় বিশেষ অভিযান চালানো হয়। এ অভিযানে মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী, কিশোর গ্যাং সদস্য ও ছিনতাইকারীসহ ১২২ জনকে গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছে।
জেলা পুলিশের এই অভিযানে সাত থানার পুলিশ সদস্যরা সমন্বিতভাবে অংশ নেন। ফলে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই জেলা পুলিশের অভিযানের গতি ও পরিধি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
এর ধারাবাহিকতায় ৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত জেলার সাতটি থানায় তিন ঘণ্টার বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ অভিযানে মাদকসেবী, মাদক কারবারি, ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ও ছিনতাইকারীসহ ১০৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই জেলার বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান, মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার এবং শতাধিক গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে।
নতুন পুলিশ সুপারের এমন তৎপরতাকে স্বাগত জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার নয় মাদক কারবারের মূল হোতা, সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষক, চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রক এবং অপরাধীদের আশ্রয়দাতাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা নবাগত এসপির কাছে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, মাদক ও কিশোর গ্যাং নির্মূলসহ সব ধরনের অপরাধ দমনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ নারায়ণগঞ্জ উপহার দেওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
রাজধানীর পাশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জে মাদক, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, কিশোর গ্যাং, ছিনতাই ও অবৈধ অস্ত্রের সমস্যা দীর্ঘদিনের। দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই এসব অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় নতুন এসপির প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও প্রত্যাশা বেড়েছে।
তবে স্থানীয়দের মতে, কয়েক দিনের অভিযানকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যে রূপ দিতে হলে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি মাদক ব্যবসার মূল নেটওয়ার্ক, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রক, অবৈধ অস্ত্রের উৎস এবং অপরাধীদের পেছনের মদদদাতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
জেলা পুলিশের সাম্প্রতিক তৎপরতায় অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট নারায়ণগঞ্জে অপরাধ দমনে নতুন পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান শুরুতেই কঠোর বার্তা দিয়েছেন। এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, এই সাঁড়াশি অভিযান যেন সাময়িক না হয়ে নিয়মিত ও টেকসই কার্যক্রমে পরিণত হয়।

