নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে একসময় ছিলেন পরস্পরের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী। ছাত্ররাজনীতি থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির দীর্ঘ পথচলায় গড়ে ওঠে একেএম শামীম ওসমান ও অ্যাডভোকেট খোকন সাহার বন্ধুত্ব। রাজনৈতিক উত্থান-পতন, মতপার্থক্য, মামলা ও ক্ষমতার পালাবদলের নানা অধ্যায় পেরিয়ে তাঁদের সম্পর্ক বরাবরই আলোচনায় ছিল। এবার দুজনের গুরুতর অসুস্থতার খবর তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও রাজনৈতিক জীবনের পুরোনো অধ্যায়গুলো সামনে নিয়ে এসেছে।
নারায়ণগঞ্জের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযাত্রী একেএম শামীম ওসমান ও অ্যাডভোকেট খোকন সাহা। একজন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং ওসমান পরিবারের রাজনৈতিক বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ মুখ, অন্যজন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও আইনজীবী নেতা। রাজনীতির ময়দানে দুজনের পরিচিতি আলাদা হলেও ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব তাঁদের সম্পর্কের অন্যতম আলোচিত দিক।
২০১৮ সালের এক সাক্ষাৎকারে শামীম ওসমানকে তুলনাবিহীন বন্ধু বলে উল্লেখ করেন খোকন সাহা। ১৯৭২ সাল থেকে বন্ধুত্ব শুরু রাজনৈতিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে দুজনের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হলেও ব্যক্তিগত সম্পর্কে তার প্রভাব পড়েনি বলে তিনি মনে করতেন। হিসেবে
শামীম ওসমান ও খোকন সাহার রাজনৈতিক পথচলার গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে নারায়ণগঞ্জের ছাত্ররাজনীতি ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম। তবে দুজনের রাজনৈতিক পরিচিতি ও প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র ছিল ভিন্ন।
শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে দীর্ঘদিন প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর জাতীয় রাজনীতিতেও তাঁর পরিচিতি বাড়ে। তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে ওসমান পরিবারের দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় ক্ষমতার সমীকরণ ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে, খোকন সাহার রাজনৈতিক উত্থান ছাত্রলীগের মাধ্যমে। সত্তরের দশকের শেষভাগে তিনি ছাত্রলীগের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। পরে শহর আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক এবং দীর্ঘ সময় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে গঠিত নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটিতে তিনি সাধারণ সম্পাদক হন। আইনজীবী হিসেবেও নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতিতে একাধিকবার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাজনৈতিক কর্মসূচি, দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এবং স্থানীয় বিভিন্ন ইস্যুতে দুজনকে দীর্ঘ সময় একসঙ্গে দেখা গেছে। তবে বন্ধুত্বের পাশাপাশি দলীয় সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্যও ছিল। ফলে তাঁদের সম্পর্ককে শুধু রাজনৈতিক জোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও দলীয় অবস্থানের মধ্যে পার্থক্যও ছিল।
শামীম ওসমানের রাজনৈতিক জীবনে মামলা ও আইনি বিতর্ক নতুন নয়। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুর্নীতির দুটি মামলায় দণ্ডিত হওয়ার পর তাঁর জামিন আবেদন নাকচ করে তাঁকে কারাগারে হয়।
পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত হতাহতের ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলা দায়ের করা হয়। ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট শিমরাইলে গুলিতে মাছ বিক্রেতা মো. মিলন নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলায়ও তাঁর নাম আসে। এ ছাড়া ২০২৫ সালের জুলাইয়ে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে শামীম ওসমান ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে।
খোকন সাহার রাজনৈতিক জীবনেও মামলা ও আইনি বিরোধের অধ্যায় রয়েছে। ২০২১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী তাঁর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করার আবেদন করেছিলেন বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। বিষয়টি নিয়ে তখন আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও আলোচনা তৈরি হয়েছিল।
এর আগে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় খোকন সাহার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছিল বলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ওপর প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়, সেসব রাজনৈতিক মামলা থেকে তিনি খালাস পেয়েছিলেন।
দীর্ঘ সময় মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা খোকন সাহার রাজনৈতিক পরিচিতি মূলত দলীয় সংগঠন, আইনজীবী রাজনীতি এবং ধর্মীয়-সামাজিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও আইনি পরিস্থিতি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে একাধিক মামলার আসামী হন।
রাজনৈতিক জীবনের নানা উত্থান-পতনের পর এবার দুজনের শারীরিক অসুস্থতার খবর আলোচনায় এসেছে। পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শামীম ওসমান ও খোকন সাহা পৃথক হাসপাতালে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ভারতের চেন্নাই হসপিটালে ভর্তি আছেন কিন্তু খোকন সাহা গুরুত্বর অবস্থায় বাংলাদেশে নাকি অন্য কোথাও আছেন সেটা এখনো নিশ্চিত ভাবে কেউ বলতে পারে না।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে শামীম ওসমান ও খোকন সাহার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় পদ-পদবি, মামলা, মতপার্থক্য এবং ক্ষমতার পালাবদল সবকিছুর মধ্যেই তাঁদের বন্ধুত্ব নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
একজন সংসদ সদস্য হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিতি পেয়েছেন, অন্যজন দলীয় সংগঠন ও আইনজীবী রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। তাঁদের রাজনৈতিক জীবনের সাফল্য, বিতর্ক ও আইনি অধ্যায় আলাদা হলেও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ইতিহাস তাঁদের একই আলোচনায় নিয়ে আসে। দুজন দুই হসপিটালে রয়েছেন তাদের শেষ দেখা হবে কি এ প্রশ্ন এখন থেকেই যাচ্ছে।

