নানা অভিযোগ, নেতৃত্বের বিরোধ, দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে মারামারি এবং পরবর্তী সময়ে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব সব মিলিয়ে অস্থিরতা বাড়ছে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতিকে ঘিরে। সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ঘটনায় আদালতপাড়ায় উত্তেজনা তৈরি হওয়ার পর সমিতির বর্তমান কমিটির ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় যে কোনো সময় কমিটি ভেঙে দেওয়া হতে পারে এমন সম্ভাবনা নিয়েও আইনজীবীদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
গত ৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতিতে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে হাতাহাতি ও উত্তেজনার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আদালতপাড়ায় বিভক্তি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করছেন। বিরোধের সূত্রপাত, সংঘর্ষে জড়িতদের ভূমিকা এবং পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সমিতির নেতৃত্ব কী পদক্ষেপ নিয়েছে এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।
একই সঙ্গে আইনজীবীদের রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষের কথা শোনা যাচ্ছে। সংঘর্ষের পর সংগঠনটির পক্ষ থেকে দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকার অভিযোগ এবং ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শামছুন নুর বাঁধনের পদত্যাগের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি আইনজীবীদের পেশাগত অধিকার রক্ষা, পারস্পরিক বিরোধ নিরসন এবং আদালতপাড়ায় স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের মধ্যেই প্রকাশ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটায় নেতৃত্বের দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের একাংশের মতে, মতবিরোধ বা নেতৃত্বকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব থাকতেই পারে। তবে তা যদি প্রকাশ্য সংঘর্ষে রূপ নেয়, তাহলে সমিতির নেতৃত্বের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণ এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় পেশাগত পরিবেশের পাশাপাশি সাধারণ আইনজীবীদের মধ্যেও আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।
এখন আলোচনায় রয়েছে, সংঘর্ষের ঘটনায় সমিতির পক্ষ থেকে কোনো তদন্ত বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না। একই সঙ্গে বর্তমান কমিটি পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে, নাকি নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দেবে সেটিও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
আইনজীবী সমিতির সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অনুমোদনে সংগঠনটির জেলা শাখার আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটির মেয়াদ তিন মাস নির্ধারণ করে সম্মেলনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে দেড় বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও সম্মেলনের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন, সাংগঠনিক কার্যক্রমের গতি এবং বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন অ্যাডভোকেট মো. জাকির হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট বেনজির আহমেদ এবং সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট কাজী আব্দুল গাফফার। যুগ্ম আহ্বায়কদের মধ্যে রয়েছেন অ্যাডভোকেট শামছুন নুর বাঁধনসহ কয়েকজন আইনজীবী।
দীর্ঘদিন সম্মেলন না হওয়া, আইনজীবীদের মধ্যে বিরোধ নিরসনে দৃশ্যমান উদ্যোগের অভাবের অভিযোগ এবং যুগ্ম আহ্বায়ক বাঁধনের পদত্যাগ এই তিনটি বিষয় সংগঠনটির নেতৃত্বকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শামছুন নুর বাঁধনের পদত্যাগের ঘটনায় সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। দীর্ঘদিন সম্মেলন না হওয়া এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্নের মধ্যে তাঁর পদত্যাগের বিষয়টি সামনে আসায় নেতৃত্বের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২০ সালের ৯ ডিসেম্বর। ওই সম্মেলনে দুটি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। পরে ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কমিটি সংগঠনটির ১২৫ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দেয়।
পরবর্তী সময়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পুরোনো কমিটি বাতিলের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এরপর ২৭ মার্চ তিন মাসের জন্য আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও সম্মেলন না হওয়ায় নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টদের একাংশ।
সম্মেলন না হওয়ায় নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি সংগঠনের বিভিন্ন পদে আগ্রহী আইনজীবীদের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা ও বলয় তৈরি হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সেটিও এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
আইনজীবী সমিতির সাম্প্রতিক সংঘর্ষ, নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন এবং আদালতপাড়ায় বিরোধের প্রেক্ষাপটে বর্তমান কমিটি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। এর মধ্যে কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুনভাবে নেতৃত্ব সাজানোর সম্ভাবনার কথাও কেউ কেউ বলছেন।
আইনজীবীদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথম প্রয়োজন সংঘর্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিষয়ে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং সমিতির নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট অবস্থান। একই সঙ্গে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সম্মেলন আয়োজন ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি ফেরানো জরুরি।
সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের আইন অঙ্গনে এখন কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে ৬ অক্টোবরের সংঘর্ষের দায় নির্ধারণ হবে কীভাবে, সমিতির নেতৃত্ব পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে কি না, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সম্মেলন কবে হবে এবং বর্তমান নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ কী?
আইনজীবীদের পেশাগত মর্যাদা ও আদালতপাড়ার স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষায় এসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি। অভিযোগ, পদত্যাগ, সংঘর্ষ এবং নীরবতার বিতর্কের অবসান ঘটাতে সংশ্লিষ্ট নেতৃত্ব কার্যকর উদ্যোগ নেয় কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন আইনজীবীরা।

