একসময় নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি মূলত আওয়ামী লীগ-বিএনপির দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ঘিরেই আবর্তিত হতো। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর সেই চিত্রে এসেছে বড় পরিবর্তন। এখন জেলার রাজনৈতিক মাঠে বিএনপির পাশাপাশি দৃশ্যমান অবস্থান তৈরি করেছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি চারটি আসন পেলেও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে এনসিপির প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল আমিনের জয় নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। ফলে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এখন আলোচনার কেন্দ্রে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিকে ঘিরে নতুন ত্রিমুখী সমীকরণ।
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটিতে বিএনপি জয় পায়। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জয় পান এনসিপির আব্দুল্লাহ আল আমিন।
বিশেষ করে ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের ফল স্থানীয় রাজনীতিতে আলাদা গুরুত্ব তৈরি করেছে। কারণ নির্বাচনের আগে এই আসনে বিএনপি ও জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের সমীকরণের পাশাপাশি এনসিপির প্রার্থীও শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন। নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত আব্দুল্লাহ আল আমিন ১ লাখ ৬ হাজার ১৭১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।
এর ফলে নারায়ণগঞ্জে বিএনপির বাইরে সংসদীয় রাজনীতিতে নতুন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক উপস্থিতি তৈরি হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অংশ হিসেবে এনসিপির প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল আমিন মাঠে সক্রিয় ছিলেন। ওই সময় জামায়াত ও এনসিপির যৌথ গণসংযোগও দেখা গেছে।
নির্বাচনের ফলের পর এই সমন্বয় নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ একটি আসনে জয় পাওয়ার মধ্য দিয়ে এনসিপি এখন শুধু নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, সংসদীয় রাজনীতির অংশ হিসেবেও নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীও জেলার বিভিন্ন এলাকায় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতিতেও দলটির নেতাদের সক্রিয়তার খবর সামনে এসেছে।
জাতীয় নির্বাচনের সময় জামায়াত-এনসিপি জোটের সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ছিল স্পষ্ট। নির্বাচনের পরও স্থানীয় পর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক পুরোপুরি মসৃণ হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে ফতুল্লার বক্তাবলীতে এনসিপির এক নেতার ওপর হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের কারণে দুই দলের স্থানীয় পর্যায়ের দূরত্ব নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এ কারণে যে, এটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের পাল্টাপাল্টি নয়; মাঠপর্যায়ে দুই দলের নেতা-কর্মীদের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তবে হামলার অভিযোগ ও মামলার বিষয়গুলো তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে। তাই কোনো পক্ষকেই অভিযোগের ভিত্তিতে দায়ী হিসেবে চূড়ান্তভাবে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই।
জাতীয় নির্বাচনের পর এনসিপি নারায়ণগঞ্জে সাংগঠনিক কার্যক্রম বাড়ানোর চেষ্টা করছে। মার্চে নারায়ণগঞ্জ মহানগরের জন্য ৪৮ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়।
এরপর স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সেপ্টেম্বরে জেলা এনসিপি স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটিও গঠন করেছে। এতে বোঝা যায়, জাতীয় নির্বাচনে একটি আসনে জয় পাওয়ার পর দলটি শুধু সংসদীয় রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না; স্থানীয় পর্যায়েও সাংগঠনিক ভিত্তি বিস্তারের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জে জামায়াতে ইসলামীও সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ, দাওয়াতি কার্যক্রম এবং স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে দলটি নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।
জাতীয় নির্বাচনে পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটিতে বিএনপি এবং একটিতে এনসিপি জয় পাওয়ায় জামায়াত সরাসরি কোনো আসন না পেলেও তাদের রাজনৈতিক উপস্থিতি কমেছে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং দলটির নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে এনসিপির নির্বাচনী সমন্বয় নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন একটি মেরুকরণ তৈরি করেছে।
এখন নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির বড় আলোচনার বিষয় স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। বিভিন্ন ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের একাধিক নেতা আগ্রহ দেখাচ্ছেন বলে স্থানীয় প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
একই সময়ে এনসিপিও স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনার জন্য কমিটি করেছে। ফলে জাতীয় নির্বাচনের পর এবার ইউনিয়ন ও স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিতেও বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে সাংগঠনিক প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে।
জাতীয় নির্বাচনে চারটি আসনে জয় পাওয়ার কারণে নারায়ণগঞ্জে বিএনপি এখন বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে অবস্থান করছে। কিন্তু একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে এনসিপির জয় দলটির সামনে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে।
বিশেষ করে ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় বিএনপির দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক প্রভাবের পাশাপাশি এনসিপির সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব এখন স্থানীয় রাজনীতির হিসাব বদলে দিয়েছে।
এর সঙ্গে জামায়াতের সাংগঠনিক তৎপরতা যুক্ত হওয়ায় আগামী দিনে প্রতিটি ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও স্থানীয় নির্বাচনী এলাকায় রাজনৈতিক সমীকরণ আগের তুলনায় জটিল হতে পারে।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে কেন্দ্র করে যে দ্বিমুখী প্রতিযোগিতা ছিল, বর্তমান বাস্তবতায় তার জায়গায় একাধিক রাজনৈতিক শক্তির সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম বর্তমানে সীমিত থাকার প্রেক্ষাপটে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে মাঠের রাজনীতিতে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে সংগঠন ধরে রাখার চেষ্টা করছে, জামায়াত নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি বাড়াচ্ছে এবং এনসিপি নতুন প্রজন্মের রাজনীতি ও স্থানীয় সংগঠন বিস্তারের দিকে এগোচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো জাতীয় নির্বাচনের পর তৈরি হওয়া নতুন শক্তির সমীকরণ স্থানীয় পর্যায়ে কতটা স্থায়ী হয়। বিএনপির চার সংসদ সদস্যের উপস্থিতি, নারায়ণগঞ্জ-৪-এ এনসিপির সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব, জামায়াতের সাংগঠনিক তৎপরতা এবং সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সব মিলিয়ে রাজনৈতিক মাঠে প্রতিযোগিতার নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে।
তবে এই প্রতিযোগিতা কতটা রাজনৈতিক কর্মসূচি ও জনসম্পৃক্ততার মধ্যে থাকবে, আর কতটা স্থানীয় আধিপত্যের দ্বন্দ্বে গড়াবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়। নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে তাই প্রশ্নটা আর শুধু ‘কে ক্ষমতায়’ বরং ‘কে কতটা মাঠে’ এবং ‘কে তৃণমূলের আস্থা ধরে রাখতে পারে’, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

