নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতিতে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারির ঘটনায় আদালতপাড়ায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) আইনজীবী সমিতি ভবনে দুই গ্রুপের মধ্যে এ মারামারির ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি ঘিরে আইনজীবীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জের আইনজীবী অঙ্গনে আদালত হস্তান্তর, নেতৃত্ব, সাংগঠনিক কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে যে অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন চলে আসছে, আজকের সংঘর্ষকে তারই নতুন বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টদের অনেকে।
ঘটনার আলোচনায় সামনে এসেছে বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এইচ এম আনোয়ার প্রধানের বলয়।
নারায়ণগঞ্জের আইনজীবী রাজনীতিতে সাখাওয়াত হোসেন খান ও এইচ এম আনোয়ার প্রধানের সম্পর্ক নতুন নয়। একসময় তারা একই রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বলয়ে সক্রিয় ছিলেন।
২০২৫ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে বিএনপিপন্থী জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম সমর্থিত প্যানেল থেকে সরকার হুমায়ূন কবিরকে সভাপতি এবং এইচ এম আনোয়ার প্রধানকে সাধারণ সম্পাদক পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়। ওই মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
পরে সরকার হুমায়ূন কবির ও আনোয়ার প্রধানের নেতৃত্বাধীন পরিষদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করে।অর্থাৎ আইনজীবী সমিতির নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সময় সাখাওয়াত ও আনোয়ারকে একই রাজনৈতিক ধারার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই দেখা হয়েছিল।
সময়ের সঙ্গে আইনজীবী অঙ্গনের সমীকরণ বদলেছে। বর্তমানে আনোয়ার প্রধান জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে সাখাওয়াত হোসেন খান বিএনপির মহানগর রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন।
গত ২৪ আগস্ট আইনজীবীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এক সংবাদ সম্মেলনে আনোয়ার প্রধান সমিতির অবস্থান তুলে ধরে বলেছিলেন, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় আইনজীবী সমিতি পাশে থাকবে।
এর আগে আইনজীবী সমিতির বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মসূচিতেও সাখাওয়াত ও আনোয়ারকে একই প্ল্যাটফর্মে দেখা গেছে। ২০২৫ সালের এক দোয়া ও ইফতার মাহফিলেও দুজন উপস্থিত ছিলেন।
কিন্তু বর্তমানে তাদের ঘিরে দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে কি না আজকের সংঘর্ষের পর সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের মধ্যেও একাধিক বলয়ের তৎপরতা ছিল। একদিকে ফোরাম সমর্থিত প্যানেল, অন্যদিকে স্বতন্ত্র অবস্থান নেওয়া আইনজীবীদের তৎপরতা সব মিলিয়ে নির্বাচনের সময় থেকেই সমিতিতে নেতৃত্বের হিসাব-নিকাশ ছিল স্পষ্ট।
নির্বাচনে আনোয়ার প্রধানের নেতৃত্বাধীন প্যানেলের সাফল্যের পর সমিতির নিয়ন্ত্রণ ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার প্রভাব কতটা থাকবে, তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা ছিল। এর মধ্যেই আজকের মারামারি সেই পুরোনো অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ায় আইনজীবীদের ঘিরে উত্তেজনার ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর বিচারপ্রার্থী একটি পরিবারকে মারধরের অভিযোগ উঠেছিল কয়েকজন আইনজীবীর বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় সাখাওয়াত হোসেন খানের নামও অভিযোগে আসে। তবে সাখাওয়াত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিলেন, তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে জানেন না এবং তাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ফলে আইনজীবী অঙ্গনে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যক্তিগত বলয়ের প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে।
৬ অক্টোবরের সংঘর্ষের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির অভ্যন্তরীণ বিরোধ কি কেবল ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক মতবিরোধ, নাকি এর পেছনে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের নেতৃত্বের বড় কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করছে?
একসময় যাদের একই রাজনৈতিক বলয়ে দেখা গেছে, তাদের ঘিরে এখন দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা আইনজীবী অঙ্গনে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, সেটিও আলোচনায় এসেছে।
তবে আজকের ঘটনার প্রকৃত কারণ, সংঘর্ষে কারা জড়িত ছিলেন এবং কোনো পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য পাওয়া গেলে পুরো চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

